বাংলাদেশের সাফল্যে গর্বিত, আনন্দ ছুঁয়ে যাচ্ছে সাবেক কোচদেরও
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ শুরুর আগে বাংলাদেশের একটি ম্যাচ জয়ের সম্ভাবনাও খুব বেশি আলোচনায় ছিল না। বরং অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে গিয়ে সম্মানজনক ক্রিকেট খেলাই ছিল টাইগারদের প্রধান লক্ষ্য। সেই বাস্তবতা বদলে দিয়ে ডারউইনে স্বাগতিকদের হারিয়ে ইতিহাস গড়েছে নাজমুল হোসেন শান্তর দল।
বাংলাদেশের এই ঐতিহাসিক জয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন দলের সাবেক কোচ ও সাবেক ক্রিকেটাররা। অস্ট্রেলিয়ার সাবেক ক্রিকেটার এবং বাংলাদেশের সাবেক প্রধান কোচ স্টুয়ার্ট ল বর্তমানে নেপালের প্রধান কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বাংলাদেশ জেতার পর জাগো নিউজে সঙ্গে আলাপে শুরুতেই তিনি নিজের উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন।
বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের সঙ্গে নিজের কাজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বর্তমান কোচ ফিল সিমন্সকেও এই জয়ের কৃতিত্ব দিয়েছেন ল। তিনি বলেন, ‘অসাধারণ একটি টেস্ট জয়, দুর্দান্ত। আমার খুব কাছ থেকে কাজ করা কয়েকজন খেলোয়াড়কে এমন বড় অর্জনে অবদান রাখতে এবং এত সুন্দর পারফরম্যান্স করতে দেখে সত্যিই খুব ভালো লাগছে।’
ফিল সিমন্সের পরিকল্পনার প্রশংসা করে ল বলেন, ‘এই জয়ের পেছনে ফিল সিমন্সেরও বড় কৃতিত্ব রয়েছে। তিনি বেশ কিছু দুর্দান্ত পরিকল্পনা করেছিলেন, আর খেলোয়াড়রা সেগুলো বুঝে নিয়ে মাঠে সফলভাবে কাজে লাগিয়েছে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই এমন বড় জয় এসেছে। ক্রিকেটের জন্য এটি সত্যিই দারুণ একটি ব্যাপার।’
বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে এটিই সেরা জয় কিনা? জানতে চাইলে স্টুয়ার্ট ল বলেন, ‘এক নম্বরে থাকা একটি দলের এমন দলের কাছে হেরে যাওয়া, যাদের জয়ের কোনো সম্ভাবনাই আগে ধরা হয়নি; অস্ট্রেলিয়ার জন্য এটি নিঃসন্দেহে বড় পরাজয়। আর বাংলাদেশের জন্য তো অবশ্যই এটি সেরা জয়।’
স্টুয়ার্ট ল বাংলাদেশের কোচ হিসেবে কাজ করেছেন দীর্ঘদিন
বাংলাদেশের ইতিহাসে এই জয়কে অন্যতম সেরা বলেও মনে করেন স্টুয়ার্ট ল। তার ভাষায়, ‘বাংলাদেশের এই প্রচেষ্টার জন্য তাদের ভীষণ গর্বিত হওয়া উচিত। নিঃসন্দেহে এটি তাদের টেস্ট ইতিহাসের সেরা ফলাফল।’
অস্ট্রেলিয়ার সাবেক ক্রিকেটার হলেও বাংলাদেশের এমন সাফল্যে নিজের আনন্দের কথা লুকাননি তিনি। ল বলেন, ‘অবশ্যই সত্যি। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের সঙ্গে আমার দারুণ একটি পথচলা ছিল। এই খেলোয়াড়দের এভাবে পারফর্ম করতে দেখে আমার মুখে স্বাভাবিকভাবেই হাসি চলে আসে। আর এমনটা হওয়াই উচিত।’
নিজ দেশ অস্ট্রেলিয়াকে নিয়ে স্টুয়ার্ট ল বলেন, ‘এই হারের পর তারা নিশ্চিতভাবেই বেশ বিব্রত বোধ করবে।’
বাংলাদেশকে ভবিষ্যতে আরও বেশি অস্ট্রেলিয়া সফরে আমন্ত্রণ জানানো হবে কি না? সে প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আশা করি এখন থেকে তারা বিষয়টি নিয়ে ভাববে। তবে তারা বাংলাদেশকে কোনোভাবেই অসম্মান করে না।’
বাংলাদেশের জয়ে খুশি দলের আরেক সাবেক প্রধান কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহেও। ব্যস্ততার কারণে ক্ষুদে বার্তায় দলের উদ্দেশে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন তিনি। হাথুরু হোয়াটসঅ্যাপে লিখেন, ‘দলের প্রত্যেক সদস্যকে অভিনন্দন। এটি অনেক বড় অর্জন। তাদের এমন সাফল্যে আমি সত্যিই গর্বিত। আশা করি, তারা এই ধারাটা ধরে রাখতে পারবে।’
টাইগারদের অনেক বড় সাফল্যের রূপকার হাথুরুসিংহে
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের পেসারদের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সেও মুগ্ধ সাবেক পেস বোলিং কোচ অ্যালান ডোনাল্ড। একসময় যাদের খুব কাছ থেকে দেখেছেন, সেই পেসারদের সাফল্যে গর্বিত তিনি।
জাগো নিউজকে ডোনাল্ড বলেন, ‘সত্যি বলতে, আজ সকালে আমি খুব একটা ভালো অনুভব করছিলাম না। সময়ের ব্যবধানও অনেক বেশি। তাই পুরো ম্যাচ না দেখে কেবল কিছু হাইলাইটস আর উইকেট দেখেছি। তবে শুরু থেকেই আমার মনে হয়েছে বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়ার চেয়ে ভালো ক্রিকেট খেলেছে এবং প্রথম দিন থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতেই ছিল।’
বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণের প্রশংসা করে ডোনাল্ড বলেন, ‘বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণ অসাধারণ পারফর্ম করেছে। হাসান মাহমুদ এই মুহূর্তে দুর্দান্ত ফর্মে আছে এবং অসাধারণ বোলিং করছে। কেন্টের হয়ে খেলার সুবাদে যে আত্মবিশ্বাস সে অর্জন করেছে, সেটি এখানে নিঃসন্দেহে তাকে অনেক সাহায্য করেছে। প্রথম ইনিংসে এমন একটি উইকেটেও সে দারুণ বোলিং করেছে, যেখানে বোলারদের জন্য কিছুটা সহায়তা ছিল।’
দলের অন্য পেসার ও স্পিনারদের পারফরম্যান্সের কথাও আলাদাভাবে উল্লেখ করেছেন ডোনাল্ড। তিনি বলেন, ‘আবারও বলছি, পুরো বোলিং আক্রমণ নিজেদের দায়িত্ব দারুণভাবে পালন করেছে-হাসান, তাসকিন, এবাদত এবং স্পিনার সবাই। সব মিলিয়ে এটি ছিল অসাধারণ একটি দলীয় পারফরম্যান্স। এরপর অবশ্যই সেই ছেলেটির কথা বলতে হয়-এই মুহূর্তে তার নামটা মনে পড়ছে না (তানজিদ তামিম), যে সেঞ্চুরি করেছে। সে দুর্দান্ত ব্যাটিং করেছে।’
এখনও শিষ্যদের হোয়াটসঅ্যাপে টিপস দেন ডোনাল্ড
বাংলাদেশের ব্যাটাররা অস্ট্রেলিয়ার স্পিনারদেরও ভালোভাবে সামলেছেন বলে মনে করেন তিনি। ডোনাল্ডের ভাষায়, ‘আমার মনে হয়েছে, বাংলাদেশ বিপক্ষের স্পিনারদের খুব ভালোভাবে সামলেছে। বল খুব একটা ঘোরেনি বলে মনে হয়েছে, আর তারা অস্ট্রেলিয়ার স্পিনারদের ওপর দারুণভাবে আক্রমণ করেছে। তাই এটি সত্যিই অসাধারণ একটি দলীয় পারফরম্যান্স। তবে শেষ পর্যন্ত ২০টি উইকেট নিতে হয়, আর সেই জায়গায় বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণ আবারও নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছে।’
বাংলাদেশের পেসারদের উন্নতিতে নিজের আনন্দের কথাও জানিয়েছেন সাবেক এই কোচ। ডোনাল্ড বলেন, ‘এটা দেখতে এবং উপভোগ করতে সত্যিই দারুণ লাগছে। পাঁচ-ছয় বছর আগে যখন প্রথম এই ছেলেদের সঙ্গে দেখা হয়েছিল, তখন তারা খেলাটাকে নিজেদের মতো করে গ্রহণ করতে কিছুটা দ্বিধায় থাকতো। এখন সেই জায়গা থেকে তারা অনেক দূর এগিয়ে গেছে। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশ যেভাবে খেলেছে, তাতে তাদের মানসিকতাটা পরিষ্কার, ‘আমরা এক পা-ও পিছিয়ে যাব না।’ পুরো ম্যাচে বাংলাদেশ ঠিক সেটাই করেছে। তারা ছিল অসাধারণ এবং খেলার প্রতিটি বিভাগেই ছিল অত্যন্ত নিখুঁত ও কার্যকর।’
শেষে নিজের সাবেক শিষ্যদের নিয়ে গর্বের কথা জানিয়ে ডোনাল্ড বলেন, ‘সব মিলিয়ে এটা ছিল অসাধারণ। আমি দলের প্রত্যেক খেলোয়াড়ের জন্য ভীষণ গর্বিত। এখনো আমি বোলিংয়ের যে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ আছে, সেখানে তাদের মেসেজ পাঠাই। তাই তাদের এমন একটি মুহূর্তে সফল হতে দেখা আমার জন্য সত্যিই খুব গর্বের বিষয়।’
এসকেডি/এমএমআর