ডারউইন টেস্ট

ছোট ছোট যেসব ঘটনা তৈরি করেছিল বড় জয়ের ভিত্তি

ইমাম হোসাইন সোহেল
ইমাম হোসাইন সোহেল ইমাম হোসাইন সোহেল
প্রকাশিত: ০৭:০৮ পিএম, ১৬ আগস্ট ২০২৬

‘ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বালিকনা বিন্দু বিন্দু জল, গড়ে তোলে মহাদেশ সাগর অতল’- বিখ্যাত ইংরেজি কবিতা দ্য লিটল থিং’স এর ভাবানুবাদ। আমেরিকান কবি জুলিয়া এ এফ কার্নি লিখেছিলেন দ্য লিটল থিং। বাংলায় প্রবাদ বাক্যটা বহুল প্রচলিত।

কোনো কিছু গড়ে তুলতে এর পেছনে ছোট ছোট অনেক কিছুর প্রয়োজন হয়। কোনো সাফল্য এমনি এমনি আসে না। সবকিছুর পেছনেই থাকে ছোট ছোট ত্যাগ, সংগ্রাম, চেষ্টা আর পরিশ্রমের অনেক গল্প। যেগুলোর সম্মিলিত ফসল হিসেবেই একটি বড় সাফল্য প্রতীয়মান হয়ে ওঠে সবার সামনে।

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়ে ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশ। স্কোরকার্ডে বড় করে লেখা থাকবে বাংলাদেশের জয়, কিন্তু এই জয় এসেছে অনেকগুলো ছোট ছোট মুহূর্তের যোগফলে। কোনোটি ছিল পেসারদের আগুনঝরা বোলিংয়ের শুরু, কোনোটি ব্যাটারের ধৈর্যের পরীক্ষা, আবার কোনোটি ছিল ফিল্ডিংয়ে ভাগ্যের সহায়তা। ডারউইন টেস্টে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়ের পেছনে থাকা সেই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোকেই ফিরে দেখা যাক।

হাসান মাহমুদের বিধ্বংসী বোলিং এবং ফাইফার

শুরুটা হয়েছিল হাসান মাহমুদের হাত ধরে। টস জিতে অস্ট্রেলিয়া ব্যাট করতে নেমে ৪৫ রানের জুটি গড়েন ওপেনাররা। এরপরই হাতে যেন আগুন ঝরাতে শুরু করেন বাংলাদেশের এই পেসার। জ্যাক ওয়েদারল্যান্ডকে উইকেটের পেছনে লিটন দাসের হাতে ক্যাচ দিতে বাধ্য করেন হাসান মাহমুদ। এরপর বোল্ড করলেন ট্রাভিস হেডকে।

এরপর নিখুঁত লাইন-লেংথে অসাধারণ নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সুইং আর গতি- সব মিলিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটারদের জন্য কঠিন পরীক্ষা হয়ে উঠেছিলেন হাসান।

hasan Mahmud

এক পর্যায়ে একের পর এক উইকেট তুলে নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং অর্ডারকে চাপে ফেলে দেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ৫৫ রান দিয়ে ৬ উইকেট নিয়ে ক্যারিয়ারসেরা বোলিং করেন হাসান। তার এই ফাইফারই প্রথম ইনিংসে অস্ট্রেলিয়াকে বড় সংগ্রহ থেকে (মাত্র ১৯৮ রানে) আটকে দেওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ।

শুরুতেই তানজিদের ক্যাচ ফেলে দিলেন নাথান লায়ন

১৯৮ রানে অলআউট অস্ট্রেলিয়া। জবাব দিতে ব্যাট করতে নামেন বাংলাদেশ দলের দুই ওপেনার তানজিদ হাসান তামিম ও সাদমান ইসলাম। দু’জনে গড়েন ৩৬ রানের জুটি। ২০ রান করে আউট হয়েছিলেন সাদমান। অসাধারণ এক সেঞ্চুরি উপহার দেন তানজিদ হাসান তামিম। ১৯৭ বলে ১০১ রান করেন তিনি। যা তার নিজের প্রথম এবং অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের যে কোনো ব্যাটারের জন্য টেস্টে প্রথম সেঞ্চুরি।

mis field

অস্ট্রেলিয়ানদের মিসফিল্ডিং

কিন্তু তানজিদ তামিমের এই সেঞ্চুরির পেছনে ছিল ভাগ্যেরও সহায়তা। দ্বিতীয় ওভারে হ্যাজেলউডের শেষ বলে টেস্ট খেলা ভুলে গিয়ে টি-২০ স্টাইলে বল উড়িয়ে মারতে চেয়েছিলেন তানজিদ তামিম। বল উঠে যায় আকাশে। সেটিই তালুবন্দী করতে পারেননি নাথান লায়ন। ক্যাচটা ছেড়ে দেন। এ সময় তামিম ছিলেন ২ রানে।

ক্যাচ মিস মানেই ম্যাচ মিস- তামিম সেটার প্রমাণ দেখালেন সেঞ্চুরি করে। বাংলাদেশের স্কোরও ৪০০ পার হয়ে যায়।

মুমিনুল-তামিমের ১০২ রানের জুটি

সাদমান ইসলাম ২০ রান করে আউট হলে জুটি বাধেন তানজিদ তামিম এবং মুমিনুল হক। একদিকে তারুণ্য এবং অন্যদিকে অভিজ্ঞতা। দুয়ের মিশেলে বাংলাদেশের ইনিংস তরতর করে এগিয়ে যেতে থাকে। দু’জন মিলে গড়েন ১০২ রানের দারুণ এক জুটি। অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটাররা যে উইকেটে খাবি খেয়েছে বাংলাদেশের বোলিংয়ের সামনে, সেই একই উইকেটে শুরুতেই সাবলিলভাবে শতরানের জুটি গড়ে ফেলায় টাইগার ব্যাটারদের মধ্যে দারুণ আত্মবিশ্বাসের জন্ম দেয়। ৪৯ রানে মুমিনুল আউট হয়ে গেলেও যে আত্মবিশ্বাস তিনি সঞ্চার করে গেছেন, সেটাই পরের ব্যাটারদের জন্য কাজে লেগেছে।

Muminul

শান্তর ৮৪- কঠিন সময়ে অধিনায়কের ব্যাট

বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করানোর অন্যতম কারিগর নাজমুল হোসেন শান্ত। অস্ট্রেলিয়ার পেস আক্রমণের বিপক্ষে অধিনায়ক খেলেছেন দায়িত্বশীল ৮৪ রানের ইনিংস।

১২৬ বলে খেলা শান্তর ইনিংসটিতেও ছিল দারুণ দুটি জুটি গড়ার রসদ। তানজিদ তামিমের সঙ্গে ৯৩ রানের জুটি গড়েন তিনি। এরপর মুশফিকুর রহিমের সঙ্গে গড়েন ৬৬ রানের জুটি। এই দুটি জুটিই বাংলাদেশের ইনিংস বড় হওয়ার ক্ষেত্রে দারুণ ভূমিকা রাখে। যদিও সেঞ্চুরির কাছে গিয়ে (৮৪ রানে) আউট হয়ে যান অধিনায়ক।

Shanto

শান্তর ব্যাটিংয়ে ছিল ধৈর্য, আবার সুযোগ পেলে আক্রমণও। একদিকে উইকেট ধরে রেখেছেন, অন্যদিকে দলের রানও এগিয়ে নিয়েছেন। তার এই ইনিংস বাংলাদেশকে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বড় লিড নেওয়ার পথে এগিয়ে দেয়। অধিনায়ক হিসেবে মাঠের নেতৃত্বের পাশাপাশি ব্যাট হাতেও শান্তর অবদান ছিল অনেক বড়।

মিরাজের ৬৫- লেজের ব্যাটারদের নিয়ে লড়াই

বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি ছিল মেহেদী হাসান মিরাজের অনবদ্য ৬৫ রান। ১৫৪ বল খেলে এই রান করেন তিনি। তানজিদ তামিম, নাজমুল শান্ত আর লিটন দাসা আউট হওয়ায় একসময় বাংলাদেশের স্কোর ছিল চাপে; কিন্তু মিরাজ লোয়ার অর্ডারকে সঙ্গে নিয়ে ইনিংসটাকে টেনে নিয়ে যান।

Miraz

একাই শুধু রান করেননি, সঙ্গীদেরও সাহস দিয়েছেন। তাসকিন, তাইজুল, হাসান মাহমুদদের সঙ্গে ছোট ছোট জুটি গড়ে অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের হতাশ করেছেন। হাসান মাহমুদের সঙ্গে ১৭০ বলের জুটি গড়ে রান করেন মাত্র ৪৬টি। শেষ পর্যন্ত তার ৬৫ রান বাংলাদেশকে ৪২৬ রানের বড় সংগ্রহ এনে দেয়। সেখান থেকেই আসে ২২৮ রানের লিড।

৯২ বলে হাসান মাহমুদের ১৪- ছোট রান, বড় মূল্য

বল হাতে বিধ্বংসী রূপ দেখিয়েছিলেন, এরপর ব্যাট হাতে দেখালেন ধৈর্য্যের চরম পরাকাষ্ট্রা। হাসান মাহমুদ ছিলেন যেন জেনুইন টেস্ট ব্যাটার। ব্যাট হাতে হয়তো তিনি করেছেন মাত্র ১৪ রান; কিন্তু তিনি বল মোকাবেলা করেছেন ৯২টি। মিরাজের সঙ্গে জুটি গড়ার ক্ষেত্রে যা দারুণ ভূমিকা রেখেছিল। ফলে বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসে এই ১৪ রানের গুরুত্ব অনেক।

৯২ বল খেলে হাসান অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের দীর্ঘ সময় আটকে রাখেন। মিরাজকে সঙ্গ দিয়ে বাংলাদেশের লিড আরও বড় করতে সাহায্য করেন। রান না এলেও তার প্রতিটি বল খেলার ধৈর্য অস্ট্রেলিয়ার ওপর চাপ বাড়িয়েছে। এই ছোট ছোট অবদানই শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের লিডকে ২০০ পেরিয়ে নিয়ে যায়। আর সেই লিডই ম্যাচের গতিপথ বদলে দেয়।

দ্বিতীয় ইনিংসের শুরুতেই হাসান আতঙ্ক

প্রথম ইনিংসে একাই নিয়েছিলেন ৬ উইকেট। যে কারণে এমনিতেই অস্ট্রেলিয়ানদের কাছ থেকে সমীহ আদায় করে রেখেছিলেন হাসান মাহমুদ। দ্বিতীয় ইনিংসের শুরুতে বল করতে এসেই জ্যাক ওয়েদারল্যান্ডকে বোল্ড করে দিলেন। এর কিছুক্ষণ পরই বোল্ড করলেন ট্রাভিস হেডকে। শুরুতেই দুই ওপেনার হাসান মাহমুদের বলে বোল্ড হওয়ায় অস্ট্রেলিয়া শিবিরে রীতিমত আতঙ্ক তেরি হয়। যার প্রভাব পড়ে পুরো ইনিংসে।

hasan

নতুন বলে অফস্ট্যাম্পের আশপাশে ধারাবাহিকভাবে বল করে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটারদের স্বস্তিতে থাকতে দেননি হাসান। দ্রুত উইকেট তুলে নিয়ে তিনি বুঝিয়ে দেন, প্রথম ইনিংসের সাফল্য কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না।

স্মিথের উইকেট- মিরাজের বুদ্ধিদীপ্ত শিকার

অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসে ৭১ রান করা স্মিথ দ্বিতীয় ইনিংসেও বাংলাদেশের জন্য বড় বাধা হয়ে উঠতে যাচ্ছিলেন। করে ফেলেছিলেন ৪৪ রান; কিন্তু মেহেদী হাসান মিরাজের হাত ধরে সেই বাধা দূর হয়।

মিরাজ বল করছিলেন পপিং ক্রিজের বেশ পেছন থেকে। সেই বলেই স্মিথকে পোক করতে বাধ্য করেন তিনি। বল সরাসরি মিরাজের কাছেই ফিরে আসে। দারুণ রিটার্ন ক্যাচ নিয়ে স্মিথকে ফেরান বাংলাদেশের এই অলরাউন্ডার।

সেই উইকেটের পর বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের উদ্‌যাপনই বলে দিয়েছিল, কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল এটি। অস্ট্রেলিয়ার ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনায় বড় ধাক্কা দিয়েছিল স্মিথের সেই উইকেট।

মিরাজের স্পিনের জাদু ও ৫ উইকেট

প্রথম ইনিংসে পেসাররা অস্ট্রেলিয়াকে ধসিয়ে দেওয়ার পর দ্বিতীয় ইনিংসে দায়িত্বটা কাঁধে তুলে নেন স্পিনাররা। বিশেষ করে মেহেদী হাসান মিরাজ ছিলেন দুর্দান্ত।

smith

উইকেটে তৈরি হওয়া ফুটমার্ক কাজে লাগিয়ে তিনি অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটারদের একের পর এক সমস্যায় ফেলেন। তার ঘূর্ণিতে ব্যাটারদের শট খেলা কঠিন হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয় ইনিংসে ৫ উইকেট নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং ধসিয়ে দেন মিরাজ। এক ইনিংসে পেসারদের ৬ উইকেট এবং পরের ইনিংসে স্পিনারদের ৬ উইকেট- বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণের বৈচিত্র্যও ফুটে ওঠে এই ম্যাচে।

গ্রিনের উইকেট- শেষ প্রতিরোধও ভেঙে দেন হাসান

অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংসে সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ গড়েছিলেন ক্যামেরন গ্রিন। সতীর্থরা একের পর এক ফিরে গেলেও তিনি এক প্রান্ত ধরে রাখেন। ২০১ বল খেলে ১০৪ রানের অনবদ্য ইনিংস খেলেন তিনি। তার ব্যাটে ছিল ধৈর্য, প্রতিরোধ এবং ম্যাচটাকে আরও দূরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা।

গ্রিনকে ফেরানো তাই বাংলাদেশের জন্য ছিল গুরুত্বপূর্ণ। সে কাজটি করেন হাসান মাহমুদ। ৯ম উইকেটে হিসেবে তিনি আউট হন হাসান মাহমুদের বলে বোল্ড হয়ে। তার উইকেট পড়ার পর অস্ট্রেলিয়ার শেষ প্রতিরোধও কার্যত ভেঙে যায়। বাংলাদেশ তখন জয়ের আরও কাছে পৌঁছে যায়।

ছোট ছোট মুহূর্তের যোগফলেই ইতিহাস

ডারউইনে বাংলাদেশের ৯ উইকেটের জয়কে শুধু হাসান মাহমুদের ৯ উইকেট, মিরাজের অলরাউন্ড পারফরম্যান্স কিংবা শান্তর ৮৪ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না। তানজিদের ক্যাচ মিস, স্মিথের জীবন পাওয়া, পরে মিরাজের হাতে তার ক্যাচ, লোয়ার অর্ডারের প্রতিরোধ, হাসানের ৯২ বলের ধৈর্য্য- সবকিছু মিলে তৈরি হয়েছে এই ইতিহাস।

কোনো একটি মুহূর্ত হয়তো ম্যাচ জেতায় না। কিন্তু এমন অনেক ছোট মুহূর্ত একসঙ্গে মিলেই তৈরি হয় বড় জয়। ডারউইনে বাংলাদেশ ঠিক সেটাই করেছে- প্রতিটি সুযোগ, প্রতিটি সেশন এবং প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তকে কাজে লাগিয়ে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে লিখেছে নতুন ইতিহাস।

আইএইচএস/

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন jagofeature@gmail.com ঠিকানায়।