নিজভূমে পরবাসী অস্ট্রেলিয়া
২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়া সফর। আনন্দ ও উন্মাদনা ছিল, সত্যি। ভয় ছিল ২০০৩ সালের দুঃসহ স্মৃতির পুনরাবৃত্তিরও। কিন্তু অস্ট্রেলিয়াকে এমন নিজ ভূমে পরবাসী করে দেবে বাংলাদেশ, এটা ভাবা মোটেও সহজ ছিল না। অবশ্য ডারউইনে বরাবরই পরবাসী অস্ট্রেলিয়া। নিয়মিত খেলে মোটেও অভ্যস্ত নয় অস্ট্রেলিয়া দল।
দেশটির ঘরোয়া ক্রিকেটের ম্যাচই বেশি হয় ডারউইনের মারারা স্টেডিয়ামে। ভিনদেশি দলগুলোর জাতীয় দলের ছায়া দলগুলোর সিরিজ হয়ে থাকে এখানে। এই মাঠের অভিষেকটাও হয়েছিল ২৩ বছর আগে, বাংলাদেশের বিপক্ষেই। সেই বাংলাদেশই ২০২৬ সালে পরবাসী বানিয়ে ছাড়লো অজিদের মারারা স্টেডিয়ামে। সবমিলিয়ে ৩টি টেস্ট ম্যাচ হয়েছে এই মাঠে ২৩ বছরে।

প্রথম দিনই আমরা হেরে গেছি: প্যাট কামিন্স
অনেকের ধারণা ছিল, বাংলাদেশকে খুব একটা গুরুত্ব না দিয়ে প্রথমসারির ভেন্যুগুলোতে দুই টেস্টের একটিও রাখা হয়নি। কিন্তু পরে সেই ভুল ধারণা ভাঙে টেস্টের প্রথম দিনেই। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, অস্ট্রেলিয়ার শীতকাল, স্থানীয় ক্রীড়া সূচি এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ব্যস্ত ক্যালেন্ডার মিলিয়েই উত্তরাঞ্চলের ডারউইন ও ম্যাকেতে এই সিরিজ আয়োজন করা হয়েছে। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের স্টেডিয়ামগুলো বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ান রুলস ফুটবল বা এএফএল-এর জন্য ব্যস্ত। ফলে বাংলাদেশ সিরিজের প্রথম টেস্ট ডারউইনের মারারা ওভালে আয়োজন করা হয়েছে।
২৩ বছর আগে খালেদ মাহমুদ সুজনের নেতৃত্বে এই ডারউইনে সিরিজের প্রথম টেস্ট খেলতে নামে বাংলাদেশ। সেই ম্যাচটি ছিল এই মাঠের ইতিহাসেরই প্রথম ম্যাচ। তাই স্বাগতিক কিংবা সফরকারী, কারোই কোনো ধারণা ছিল না মাঠটা নিয়ে। তখনকার বাংলাদেশ লড়াই করবে, এমনটা ভাবাও ছিল কঠিন। সেই ম্যাচের ইনিংস ও ১৩২ রানের পরাজয়ের স্কোরকার্ড খুললে সবই স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার কথা সমর্থকদের কাছে।
প্রথম ইনিংসে ৯৭ রানে অলআউট হওয়া বাংলাদেশের বিপক্ষে ড্যারেন লেহম্যান ও স্টিভ ওয়াহর শতকে ৪০৭ রান করে ইনিংস ঘোষণা করে শক্তিশালী অজিরা। দ্বিতীয় ইনিংসে ১৭৮ রানে গুটিয়ে গেলে ইনিংস ও ১৩২ রানে পরাজয় লেখা হয় সুজনের দলের কপালে। ভেন্যুর উদ্বোধনটা দাপুটে জয়ে স্মরণীয়ই করে রাখে হলুদ জার্সিধারিরা।

২০২৬ সালে এসে আবারও বাংলাদেশকে দিয়েই এই মাঠে ফিরলো টেস্ট ক্রিকেট। ২২ বছর পর মারারা স্টেডিয়ামে ফেরা টেস্ট ম্যাচটাই হয়ে থাকলো এই মাঠের সবচেয়ে বেশি স্মরণীয়। অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেটও তাদের ডারউইনের ভেন্যুর কথা মনে করতে গিয়ে এই ম্যাচটার কথা না মনে করে পারবে না।
মাঠটি চালু হওয়ার পরের বছরই অবশ্য ২০০৪ সালে শ্রীলঙ্কাকে এই মাঠে আতিথ্য দেয় অজিরা। সেই ম্যাচেও দাপুটে জয় ছিল। ১৪৯ রানের জয় অ্যাডাম গিলক্রিস্টের দল। ২০৭ রালে অজিরা প্রথম ইনিংসে অলআউট হয়ে যায়। সম্ভাবনা তৈরি হয় লঙ্কানরা ভালো কিছুই করবে। তবে এক বছর আগে বাংলাদেশকে যেভাবে ৯৭ রানে অলআউট করেছিল, ঠিক একইভাবে শ্রীলঙ্কাকেও একই রানে গুটিয়ে দেয় গ্লেন ম্যাকগ্রারা। দ্বিতীয় ইনিংসে অস্ট্রেলিয়া করে ২০১ রান। ৩১২ রানের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে ১৬২ রানে থামে লঙ্কানরা। ফলে ১৪৯ রানের বড় জয় পায় স্বাগতিকরা।
অর্থ্যাৎ, দুই ম্যাচে শতভাগ জয় নিয়ে দারুণ রেকর্ড ছিল অস্ট্রেলিয়ার ডারউইনে। সেই রেকর্ডটায় প্রভাব ফেললো বাংলাদেশ। সেই মাঠে এখন জয়ের অংশীদার লাল সবুজের প্রতিনিধিরাও। ২৩ বছর আগের বাংলাদেশ আর এই বাংলাদেশ এক নয়, সেটিই প্রমাণ করলো নাজমুল হোসেন শান্তর দল।

প্রথম ইনিংসে হাসান মাহমুদের ৬ উইকেটেই ম্যাচ থেকে মানসিকভাবে ছিটকে যায় অস্ট্রেলিয়া ১৯৮ রানে অলআউট হয়ে। যেখানে অজিদের পেস, বাউন্স আর সুইং বিভ্রান্ত করবে আশঙ্কা করা হচ্ছিল সফরকারীদের, হয়েছে সম্পূর্ণ তার ব্যতিক্রম। হাসানের নিখুঁত বোলিংয়ে ভ্যাবাচাকা খেয়েছেন ট্রাভিস হেড-স্টিভ স্নিথরা।
মিচেল স্টার্ক, প্যাট কামিন্স ও জশ হ্যাজেলউডকে তুলোধুনো করে ক্যারিয়ারের মাত্র দ্বিতীয় ইনিংসেই অনবদ্য এক সেঞ্চুরি হাঁকান তানজিদ হাসান তামিম। যা ছিল তার টেস্ট ক্যারিয়ারের প্রথম। ফিফটি মিস করলেও মুমিনুল করেন ৪৯ রান। সেঞ্চুরির সম্ভাবনা জাগিয়ে তোলেন অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তও। যদিও থামতে হয় ৮৪ রানে।
তবে সবচেয়ে বেশি ভুগিয়েছেন সম্ভবত মেহেদী হাসান মিরাজ। শক্তিশালী অজিদের সত্যিই নিজ ভূমে পরবাসী অনুভূতিটা সম্ভবত তিনিই দিয়েছেন সর্বাধিকবার। দ্বিতীয় দিন ২৯৭ রানে ৩ উইকেট থেকে ১১ রানের মধ্যে আরও ৩ উইকেট হারিয়ে ৬ উইকেটে ৩০৮ রান হয়ে যায় বাংলাদেশের স্কোর। সেখান থেকে মিরাজের ৬৫ রানের ইনিংসেই ৪২৬ রানের দলীয় সংগ্রহ ও ২২৮ রানের লিড পায় সফরকারীরা।

এরপর বল হাতেও অজিদের চেপে ধরেন তিনি। নিজের সহজাত বোলিংয়ে ফাইফারের পাশাপাশি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে দ্বিতীয় বাংলাদেশি বোলার হিসেবে নেন ১০০ উইকেট। আর প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ১০০ উইকেট ও হাজারের ওপর রানের রেকর্ড গড়েন তিনি। বিশেষ করে স্টিভ স্মিথকে ফিরিয়ে মিরাজ ম্যাচে দারুণ অবস্থানে নেন বাংলাদেশকে। ফিরিয়েছেন অ্যালেক্স ক্যারি, প্যাট কামিন্স, বেউ ওয়েবস্টার ও নাথান লায়নকেও। মাত্র ৫৭ রানের লক্ষ্য পেয়ে ৯ উইকেটে টপকে যেতে মোটেও কষ্ট হয়নি বাংলাদেশের।
এতে করেই স্পষ্ট যে, স্মরণীয় এই জয়ে ডারউইনের মারার স্টেডিয়ামে অস্ট্রেলিয়া ঠিক কতটা পরবাসী হয়ে পড়েছিল বাংলাদেশের সামনে। সিরিজের পরের টেস্ট ২২ আগস্ট থেকে শুরু হবে ম্যাকায়তে। সেই মাঠেও মাত্র তিন টেস্ট খেলেছে স্বাগতিকরা।
ডারউইন টেস্টে টাইগারদের সাফল্যে কাজে দিয়েছে নিজেদের মাঠে অজিদের অনভিজ্ঞতা। সেই সুযোগ নিয়ে ধবলধোলাইয়ের ইতিহাসটাও কি হয়ে যাবে ম্যাকায়তে, স্বপ্ন দেখতে ক্ষতি কোথায়?
আইএন
