অস্ট্রেলিয়ার দুর্গে বাংলাদেশের হানা, এই জয় কেন এত বড়?

মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান
মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান , জ্যেষ্ঠ সহ-সম্পাদক
প্রকাশিত: ১২:৩২ পিএম, ১৬ আগস্ট ২০২৬

বাংলাদেশের মতো ‘মিনোস’ দলের বিপক্ষে খেলে কী হবে? অযথা সময় নষ্ট। বাংলাদেশকে নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার মনোভাবটা যেন এমনই ছিল। মাঠের বাইরের কথাবার্তা থেকে শুরু করে অস্ট্রেলিয়ার গণমাধ্যমের আলোচনাতেও বাংলাদেশের জন্য বারবার ব্যবহৃত হয়েছে ‘মিনোস’ শব্দটি। অথচ সেই মিনোসের কাছেই এবার নিজেদের মাটিতে নাকানি-চুবানি খেতে হলো বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম পরাশক্তি অস্ট্রেলিয়াকে।

অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটীয় শক্তি নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। টেস্ট ক্রিকেটে নিজেদের মাটিতে তারা কতটা ভয়ংকর, সেটিও ক্রিকেটবিশ্বের অজানা নয়। সেই দলকেই অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে চার দিন দাপট দেখিয়ে ৯ উইকেটের বড় ব্যবধানে হারিয়েছে বাংলাদেশ। শুধু জয় নয়, ম্যাচের প্রায় পুরোটা সময়জুড়েই অস্ট্রেলিয়ানদের চোখেমুখে হতাশা ভর করিয়েছে নাজমুল হোসেন শান্তর দল।

তাহলে এই জয়কে কি শুধুই ‘মিনোসের ঘটানো আপসেট’ বলে এড়িয়ে যাওয়া যায়?

আরও পড়ুন

ব্যাটে-বলে-ফিল্ডিংয়ে কোনো সুযোগই অস্ট্রেলিয়াকে দেয়নি টাইগাররা

টেস্ট ক্রিকেটে আপসেট করা এত সহজ নয়। ওয়ানডে কিংবা টি-টোয়েন্টি এক দিনের ক্রিকেট। নির্দিষ্ট দিনে একটি দল অসাধারণ খেলতে পারে, অন্য দলটি প্রত্যাশার তুলনায় অনেক খারাপ করতে পারে। ফলে সেখানে হঠাৎ করে বড় দলের বিপক্ষে ছোট দলের জয়কে ‘আপসেট’ বলে ব্যাখ্যা করার সুযোগ থাকে।

কিন্তু টেস্ট ক্রিকেট সম্পূর্ণ ভিন্ন। পাঁচ দিনের ক্রিকেটে একটি ম্যাচ জিততে হলে ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিং, কৌশল-সব বিভাগেই ধারাবাহিকভাবে ভালো করতে হয়। এক-দুই ঘণ্টার দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দিয়ে টেস্ট জেতা যায় না। বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ার মতো দলের বিপক্ষে তাদের নিজেদের কন্ডিশনে চার দিনের মধ্যে জয় পাওয়া আরও কঠিন।

আর বাংলাদেশ ঠিক সেটাই করেছে।

ঘরের মাঠের সুবিধা, সেই যুক্তিও আর খাটছে না। বাংলাদেশের বড় দলকে হারানোর প্রসঙ্গ উঠলেই এতদিন একটি যুক্তি সামনে আনা হতো- বাংলাদেশ শুধু নিজেদের ঘরের মাঠে, নিজেদের পছন্দের উইকেট বানিয়ে বড় দলকে হারায়। সেই যুক্তির জায়গাটিও এবার অনেকটাই শেষ হয়ে গেল।

বাংলাদেশ নিউজিল্যান্ডের মাটিতে টেস্ট জিতেছে। পাকিস্তানের মাটিতে গিয়ে তাদের হোয়াইটওয়াশ করেছে। এবার অস্ট্রেলিয়ার মাটিতেও তাদেরই বিপক্ষে টেস্ট জিতলো। অর্থাৎ, ঘরের মাঠের সুবিধা নয়। ভিন্ন কন্ডিশন, ভিন্ন আবহাওয়া, ভিন্ন উইকেট এবং ভিন্ন প্রতিপক্ষের বিপক্ষেও বাংলাদেশ যে টেস্ট জিততে পারে, তার প্রমাণ এখন একাধিক।

উপমহাদেশের দলগুলোর জন্য অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশন বরাবরই কঠিন। বাউন্স, গতি, বড় মাঠ, দ্রুতগতির আউটফিল্ড। সব মিলিয়ে সেখানে মানিয়ে নেওয়া সহজ নয়।

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ভারতও একবার মাত্র ৩৬ রানে অলআউট হয়েছিল। পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কার মতো দলও দীর্ঘ সময় ধরে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে সাফল্যের জন্য সংগ্রাম করেছে। সেই জায়গায় বাংলাদেশ শুধু ম্যাচ খেলেনি, অস্ট্রেলিয়াকে চার দিন ধরে চাপে রেখে ম্যাচ শেষ করেছে।

এবার নজর বুলানো যাক কয়েকটি পরিসংখ্যানে। এই জয় কেন আর দশটি জয়ের থেকে আলাদা, সেটি বুঝতে এই তথ্যগুলোই যথেষ্ট।

*অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এখন পর্যন্ত কোনো টেস্ট জিততে পারেনি শ্রীলঙ্কা।

*একবিংশ শতাব্দীতে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে কোনো টেস্ট জিততে পারেনি পাকিস্তানও। সবশেষ তারা অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট জিতেছিল ১৯৯৫ সালে।

*২০১৪ সালের ডিসেম্বরের পর থেকে নিজেদের মাটিতে ৪৯ টেস্টে অস্ট্রেলিয়া জিতেছে ৩৪টিতে, হেরেছে মাত্র ৬টিতে। অর্থাৎ নিজেদের মাঠে অস্ট্রেলিয়াকে হারানো কতটা কঠিন, এই পরিসংখ্যানই তার বড় প্রমাণ।

*অস্ট্রেলিয়া বর্তমানে টেস্ট র‍্যাঙ্কিংয়ের এক নম্বর দল। একই সঙ্গে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের পয়েন্ট টেবিলেও তারা শীর্ষে রয়েছে।

*অস্ট্রেলিয়ার চারজন বোলার — মিচেল স্টার্ক, প্যাট কামিন্স, জশ হ্যাজেলউড ও নাথান লায়ন। আইসিসি টেস্ট বোলিং র‍্যাঙ্কিংয়ের সেরা দশে রয়েছেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, বাংলাদেশের বিপক্ষে হারা টেস্টে চারজনই খেলেছেন।

*অস্ট্রেলিয়ার দুই ব্যাটার আইসিসি টেস্ট ব্যাটিং র‍্যাঙ্কিংয়ের সেরা পাঁচে রয়েছেন। ট্রাভিস হেড এক নম্বরে এবং স্টিভেন স্মিথ চার নম্বরে। বাংলাদেশের বিপক্ষে সেই টেস্টেও দুজনই ছিলেন।

*আরও অবিশ্বাস্য তথ্য হলো, স্টার্ক, কামিন্স, হ্যাজেলউড ও লায়নের সম্মিলিত টেস্ট উইকেট সংখ্যা ১,৬০০-এর বেশি। প্রত্যেকেরই রয়েছে ৩০০-এর বেশি টেস্ট উইকেট। ইতিহাসের প্রথম দল হিসেবে এই চারজনকে একসঙ্গে নিয়ে মাঠে নেমেছিল অস্ট্রেলিয়া।

*আর সর্বশেষ অ্যাশেজের কথা তো বলাই যায়। এই একই অস্ট্রেলিয়া দল নিজেদের মাঠে ইংল্যান্ডকে ৪-১ ব্যবধানে উড়িয়ে দিয়েছিল। সেই দলই এবার বাংলাদেশের কাছে নিজেদের মাটিতে হারলো।

অর্থাৎ, বাংলাদেশ এমন কোনো অস্ট্রেলিয়াকে হারায়নি, যারা দুর্বল একাদশ নিয়ে মাঠে নেমেছিল। অস্ট্রেলিয়া ছিল পূর্ণ শক্তির দল। তাদের বিশ্বমানের বোলিং আক্রমণ ছিল, শীর্ষস্থানীয় ব্যাটার ছিল, নিজেদের কন্ডিশন ছিল, ছিল র‍্যাঙ্কিং ও পরিসংখ্যানের বিশাল শ্রেষ্ঠত্ব।

তারপরও ম্যাচের ফল — বাংলাদেশের জয়। তাই এই জয়কে শুধু ‘আপসেট’ কিংবা ‘মিনোসের অঘটন’ বলে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের সাম্প্রতিক পথচলার একটি বড় মাইলফলক।

আরও পড়ুন

ডারউইন টেস্ট / পরাশক্তি অস্ট্রেলিয়াকে তাদেরই মাঠে হারিয়ে ইতিহাস গড়লো বাংলাদেশ

নিউজিল্যান্ডের মাটিতে জয়, পাকিস্তানের মাটিতে সিরিজে আধিপত্য, এবার অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট জয়। বাংলাদেশ যে ধীরে ধীরে বিদেশের মাটিতেও নিজেদের প্রমাণ করতে শিখছে, এই জয় তারই বড় বার্তা।

‘মিনোস’ হিসেবে যাদের অবহেলা করা হয়েছিল, সেই বাংলাদেশই এবার বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম পরাশক্তিকে তাদের নিজেদের দুর্গে হারিয়ে দিয়েছে।

নাজমুল হোসেন শান্তর দলের এই কীর্তি সত্যিই বিশ্বাস করা কঠিন!

এমএমআর/আইএন

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন jagofeature@gmail.com ঠিকানায়।