ব্রডব্যান্ডে বিদেশি বিনিয়োগে বড় ছাড়, বৈষম্যের শঙ্কা দেশীয় উদ্যোক্তাদের

এমদাদুল হক তুহিন
এমদাদুল হক তুহিন এমদাদুল হক তুহিন , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১২:৩৪ পিএম, ২৯ আগস্ট ২০২৬
টেলিযোগাযোগ খাতের নতুন খসড়া নীতিমালা নিয়ে দেশীয় উদ্যোক্তাদের আপত্তি, ছবি: জাগো নিউজ গ্রাফিক্স
  • দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তার সমান সুযোগ চান খাতসংশ্লিষ্টরা
  • নতুন নীতিমালা আগের চেয়ে ভালো, বৈষম্য না রাখার দাবি
  • আইএসপি খাতে বিদেশি বিনিয়োগ ৪৯ শতাংশের বেশি নয়: আইএসপিএবি
  • দেশীয় প্রতিষ্ঠানকে সুরক্ষা দিতেই শতভাগ বিদেশি বিনিয়োগ নয়: বিটিআরসি চেয়ারম্যান

টেলিযোগাযোগ খাতের নতুন খসড়া নীতিমালায় বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানে সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ ও মোবাইল অপারেটরের ক্ষেত্রে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত বিদেশি মূলধনের সুযোগ রাখার প্রস্তাব রয়েছে। একই সঙ্গে নতুন লাইসেন্স কাঠামো, অবকাঠামো ভাগাভাগি ও একাধিক স্তরে বিনিয়োগের বিধান নিয়েও তৈরি হয়েছে নতুন আলোচনা। দেশীয় উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের পাশাপাশি তাদের জন্যও সমান সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার টেলিযোগাযোগ খাতের নীতিমালা পরিবর্তনের উদ্যোগ নেয়। সে সময়কার খসড়ায় থানা ও ইন্টারনেট সার্ভিস প্রভাইডার (আইএসপি) লাইসেন্স বিলুপ্তির উদ্যোগে প্রতিবাদে আন্দোলনে নামে ছোট আইএসপি প্রতিষ্ঠানগুলো। নানা পক্ষ থেকে আপত্তি আসায় অন্তর্বর্তী সরকার সেই নীতিমালা চূড়ান্ত করতে পারেনি। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে খসড়া নীতিমালায় আরও পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেয়। তবে বিএনপি সরকারের এই নীতিমালায়ও বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে অধিক সুযোগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো।

ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটে বিদেশি বিনিয়োগের সীমা ৮০ শতাংশ

‘টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক ও লাইসেন্সিং পলিসি, ২০২৬’-এর নতুন খসড়ায় মোবাইল অপারেটরে সর্বোচ্চ ৯০ শতাংশ পর্যন্ত বিদেশি মূলধনের সুযোগ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে বিদেশি বিনিয়োগের সর্বোচ্চ সীমা ৮০ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে।

আরও পড়ুন

টেলিকম খাত করমুক্ত করতেই নতুন নীতিমালা: ফয়েজ আহমদ


বিটিআরসিতে ইন্টারনেট ব্যবসায়ীদের অবস্থান, টেলিকম নীতি সংশোধন দাবি

খসড়া অনুযায়ী, মোবাইল অপারেটরের ক্ষেত্রে অন্তত ১০ শতাংশ অর্থবহ স্থানীয় বা বাংলাদেশি মালিকানা থাকতে হবে। ইন্টারনেট সেবাদাতাদের ক্ষেত্রে অন্তত ২০ শতাংশ দেশীয় মালিকানা বাধ্যতামূলক রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এছাড়া শেয়ার্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার বা যৌথ অবকাঠামো খাতে সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ বিদেশি মূলধনের সুযোগ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক কানেকটিভিটি খাতে বিদেশি বিনিয়োগের সর্বোচ্চ সীমা ৪৯ শতাংশ। অর্থাৎ এ ক্ষেত্রে অন্তত ৫১ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা বাংলাদেশিদের হাতে রাখার প্রস্তাব রয়েছে। আর স্যাটেলাইট সেবার ক্ষেত্রে জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার শর্তে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বিদেশি মূলধনের সুযোগ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এমন সব প্রস্তাব বাস্তবায়ন হলে দেশীয় ইন্টারনেট অবকাঠামো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের। আর এতে ইন্টারনেট অবকাঠামোতে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব নষ্ট হবে বলেও মন্তব্য কারো কারো।

আরও পড়ুন

আইএসপিএবি সভাপতি / বাজেটে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট উপেক্ষিত, কিছুই পাইনি আমরা

দেশি-বিদেশি সব প্রতিষ্ঠানের জন্য সমান সুযোগ থাকা উচিত

টেলিযোগাযোগ খাতে দেশি-বিদেশি সব প্রতিষ্ঠানের জন্য সমান সুযোগ থাকা উচিত বলে মন্তব্য করেছেন তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির। জানতে চাইলে জাগো নিউজকে তিনি বলেন, ‘টেলিকম খাতে বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়ায় আমাদের আপত্তি নেই; তবে দেশি ও বিদেশি উদ্যোক্তাদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। প্রস্তাবিত টেলিকম নীতিমালায় বিদেশি বিনিয়োগকারীদের একাধিক লেয়ারে ব্যবসার সুযোগ দেওয়ার বিপরীতে দেশীয় উদ্যোক্তাদের একই সুযোগ না থাকায় দেশীয় উদ্যোক্তাদের প্রতি বৈষম্য তৈরি হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন,‘বিদেশি বিনিয়োগকারী একাধিক স্তরে বিনিয়োগের সুযোগ পেলে বিদেশি প্রতিষ্ঠান এক স্তরের ব্যবসার মুনাফা অন্য স্তরে ব্যবহার করে বাজারে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা নিতে পারবে। আর সেটা যদি তারা পায়, তাহলে দেশীয় উদ্যোক্তারা ব্যবসা হারিয়ে আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। আমাদের ভয়ের জায়গাটা এখানেই। দেশীয় উদ্যোক্তা যদি সুযোগ না পান , তাহলে বিদেশিদেরও সেই সুযোগ দেওয়া উচিত নয়।’

আইএসপি, ট্রান্সমিশন, মোবাইল অপারেটর কিংবা আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সংযোগ—কোনো ক্ষেত্রেই বিদেশি বিনিয়োগে আপত্তি নেই জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আইএসপি সেক্টরেও যদি বিদেশি বিনিয়োগ আনতে পারে, আনুক। ট্রান্সমিশনেও আনুক। মোবাইল অপারেটরের ক্ষেত্রে আনুক বা ইন্টারন্যাশনাল সাইডে আনুক—তাতেও আমার কোনো আপত্তি নেই।’

তবে লাইসেন্স কাঠামোয় দেশীয় ও বিদেশি উদ্যোক্তাদের জন্য একই নিয়ম রাখার দাবি জানিয়ে সুমন আহমেদ সাবির বলেন, ‘আমাদের দেশীয় উদ্যোক্তারা যেকোনো একটা লেয়ারে প্লে করতে পারবে, তাহলে বিদেশি উদ্যোক্তারাও তাই থাক। তারাও একটা লেয়ারে প্লে করুক। অথবা দেশীয়দেরও তিন লেয়ারেই সুযোগ দেওয়া হোক, বিদেশিদেরও তিন লেয়ার ওপেন থাক।’

আরও পড়ুন

রাজধানীর ধানমন্ডি / একই ক্যাবলে মিলবে যে কোনো ব্রডব্যান্ড প্রতিষ্ঠানের ইন্টারনেট সেবা

নতুন নীতিমালা আগের চেয়ে ভালো

বাংলাদেশের প্রথম এবং বৃহত্তম বেসরকারি ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক (এনটিটিএন) অপারেটর ফাইবার অ্যাট হোম, যারা দেশজুড়ে অপটিক্যাল ফাইবার অবকাঠামো সরবরাহ করে।

জানতে চাইলে ফাইবার অ্যাট হোমের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান মঈনুল হক সিদ্দিকী জাগো নিউজকে বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের পাশাপাশি স্থানীয় উদ্যোক্তাদেরও সমান বিনিয়োগের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। নতুন নীতিমালায় বিভিন্ন স্তরে বিনিয়োগের সুযোগ রাখা হলেও বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যে সুযোগ পাবেন, স্থানীয় উদ্যোক্তারাও যেন একই সুযোগ পান—এতে কোনো বৈষম্য থাকা উচিত নয়।

বিদ্যমান বিনিয়োগের বিষয়ে তিনি বলেন, বিভিন্ন স্তরে অনেক উদ্যোক্তা দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করছেন। তাদের বিনিয়োগ একদিনে প্রত্যাহার বা একটি স্তর থেকে বের করে দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। একজন উদ্যোক্তা ১০-২০ বছর ধরে ব্যবসা করছেন, একাধিক স্তরে তার বিনিয়োগ রয়েছে। হঠাৎ করে একটি স্তর ছেড়ে দিতে বললে তিনি সেটি কোথায় বিক্রি করবেন, কত দামে বিক্রি করবেন—এসব বিষয়ও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। নীতিমালায় এ জায়গায় একটি গ্যাপ রয়েছে।

নতুন নীতিমালার সামগ্রিক বিষয়ে মঈনুল হক সিদ্দিকী বলেন, ‘পলিসিটা আগের থেকে এখন অনেক বেশি ওয়েল-থট হয়েছে বলে আমার ধারণা। যথেষ্ট ক্লিয়ার করা হয়েছে। আগে অনেক অ্যানোমালি ছিল। এখন যারা করছে, তারা অনেক কিছু ওয়েল-ডিফাইন করেছে। এটা পজিটিভ।’

তবে নীতিমালার ভিত্তিতে সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন প্রণয়ন ও তার যথাযথ বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, ‘পলিসির ওপর বেস করে যেন গাইডলাইনগুলো হয়, ডিফাইন করে দেয়। আর ডিফাইন করার থেকে সবচেয়ে বড় আমাদের যে চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশে, সেটা হলো এনফোর্সমেন্ট। গাইডলাইন করল, পলিসি করল, পলিসির পর একটা গাইডলাইন করল। গাইডলাইনটা কেউ যদি কন্টিনিউয়াসলি ভায়োলেট করে যায়, সেটা যদি এনফোর্সমেন্ট না হয়, তাহলে কোনো সুন্দর পলিসিও সুন্দরভাবে টিকে না।’

আরও পড়ুন

‘সরকার করহার না কমালে ইন্টারনেটের দাম কমবে না’

দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীর জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকতে হবে

দীর্ঘদিন ধরে দেশে বিনিয়োগ করে ফাইবার অবকাঠামো গড়ে তোলা দেশীয় এনটিটিএন প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ সুরক্ষিত রাখার দাবি জানিয়ে সামিট কমিউনিকেশনস লিমিটেডের এমডি ও সিইও আরিফ আল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘এনটিটিএন প্রতিষ্ঠানগুলো বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করে দেশব্যাপী ফাইবার অবকাঠামো তৈরি করেছে। এই অবকাঠামোই ব্রডব্যান্ড ও টেলিযোগাযোগ সেবার মেরুদণ্ড। নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করতে গিয়ে বিদ্যমান দেশীয় বিনিয়োগকারীরা যেন অযৌক্তিকভাবে পিছিয়ে না পড়ে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।’

শেয়ার্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার খাতে বিদেশি বিনিয়োগকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ইনফ্রাস্ট্রাকচার শেয়ারিং, ফেয়ার প্রাইস, নন ডিসক্রিমিনেশন ও ওপেন অ্যাক্সেস নিশ্চিত করতে হবে। সবাই সমান সুযোগ পেলে বিদেশি বিনিয়োগের পাশাপাশি দেশীয় বিনিয়োগও উৎসাহিত হবে।’

আরিফ আল ইসলাম আরও বলেন, ‘দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীর জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকতে হবে। দীর্ঘদিন যারা বিনিয়োগ করেছে, তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করেই নতুন বিনিয়োগের জন্য বাজার উন্মুক্ত করা উচিত।’

তার মতে, নতুন নীতিমালার লক্ষ্য হওয়া উচিত বিনিয়োগ ও প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি, সেবার মান উন্নয়ন এবং গ্রাহকের জন্য সাশ্রয়ী ইন্টারনেট নিশ্চিত করা—কোনো নির্দিষ্ট পক্ষকে সুবিধা দেওয়া নয়।

আরও পড়ুন

জুলাই থেকে কার্যকর / সারাদেশে একই দামে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট

আইএসপি খাতে বিদেশি বিনিয়োগ ৪৯ শতাংশের বেশি হওয়া উচিত নয়

দেশের ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা বা আইএসপি খাতে বিদেশি বিনিয়োগ ৪৯ শতাংশের বেশি হওয়া উচিত নয় বলে মনে করেন ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবাদাতাদের সংগঠন ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (আইএসপিএবি) সভাপতি ও আম্বার আইটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আমিনুল হাকিম। তার মতে, বিদেশি বিনিয়োগ এর বেশি হলে ডেটা নিরাপত্তা ও ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব নিয়ে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

জাগো নিউজকে মোহাম্মদ আমিনুল হাকিম বলেন, ‘খসড়া গাইডলাইনে আইএসপি খাতে ৮০ শতাংশ বিদেশি ও ২০ শতাংশ স্থানীয় বিনিয়োগের প্রস্তাব করা হয়েছে। আমরা এর পরিবর্তে বিদেশি বিনিয়োগ সর্বোচ্চ ৪৯ শতাংশ এবং স্থানীয় বিনিয়োগ ৫১ শতাংশ রাখার দাবি জানিয়েছি। কারণ আইএসপিরা সরাসরি গ্রাহকের লাস্ট মাইল কানেকটিভিটি দেয়। এখানে বিদেশি মালিকানা বেশি হলে ডেটা নিরাপত্তা ও ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত।’

আরও পড়ুন

ফোরজির সর্বনিম্ন গতি হবে ১০ এমবিপিএস, সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর

দেশীয় প্রতিষ্ঠানকে সুরক্ষা দিতেই শতভাগ বিদেশি বিনিয়োগ নয়: বিটিআরসি

জানতে চাইলে দেশীয় প্রতিষ্ঠানকে সুরক্ষা দিতেই শতভাগ বিদেশি বিনিয়োগ ‘অ্যালাউ’ করা হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মো. এমদাদ উল বারী। জাগো নিউজকে তিনি বলেন, ‘ব্রডব্যান্ড অবকাঠামোয় দেশীয় কোম্পানি শতভাগ বিনিয়োগ করতে পারবে। দেশীয় উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুরক্ষা দিতেই বিদেশিদের শতভাগ বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। কোনো বিদেশি সরাসরি আসতে পারবে না বাংলাদেশি পার্টনার ছাড়া- দ্যাটস দ্য আইডিয়া।’

বিদেশি বিনিয়োগের সীমা সম্পর্কে বিটিআরসি চেয়ারম্যান বলেন, ‘যদি বিদেশিরা কেউ আসে, সে ১০০ শতাংশ ইনভেস্ট করতে পারবে না। সে ৮০ শতাংশ বা হোয়াটএভার সরকার যেটা ডিসাইড করবে, তার বেশি পারবে না। কিন্তু বাংলাদেশে যারা আছে তারা ১০০ শতাংশ পারবে।’

আরও পড়ুন

ইন্টারনেট তারের জঞ্জাল কমাবে ‘অ্যাক্টিভ শেয়ারিং’

বিদেশি বিনিয়োগে বড় সুযোগ, ক্রস-ওনারশিপ নিয়ে প্রশ্ন

খসড়া এনআইসিএসপি (ন্যাশনাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার অ্যান্ড কানেক্টিভিটি সার্ভিস প্রোভাইডার) নির্দেশিকার ৭.২.১–৭.২.৩ ধারায় একই প্রতিষ্ঠানকে একাধিক এনআইসিএসপি লাইসেন্স নেওয়ার সুযোগ না দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি এএনএসপি, আইসিএসপি বা এনটিএনএসপি লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানও এনআইসিএসপি লাইসেন্সের জন্য অযোগ্য হবে। এসব বিধিনিষেধ আবেদনকারীর শেয়ারহোল্ডার, মালিক বা অংশীদারদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হওয়ার কথা বলা হয়েছে।

তবে ৭.২.৩ ধারায় বিদেশি মালিকানাধীন নতুন লাইসেন্সধারী বা আবেদনকারীর ক্ষেত্রে এ বিধিনিষেধ প্রযোজ্য না হওয়ার কথা উল্লেখ থাকায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন দেশীয় উদ্যোক্তারা। তাদের অভিযোগ, এতে বিদেশি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের জন্য একাধিক স্তরে বিনিয়োগ বা ক্রস-ওনারশিপের সুযোগ তৈরি হতে পারে, যেখানে একই সুযোগ দেশীয় উদ্যোক্তাদের জন্য স্পষ্ট নয়। খসড়া নীতিমালায় আইএসপি খাতে সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ পর্যন্ত বিদেশি বিনিয়োগের প্রস্তাব থাকায় বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

তবে বিটিআরসি চেয়ারম্যান এমদাদ উল বারী জানিয়েছেন, দেশি-বিদেশি কোনো প্রতিষ্ঠানকেই সাধারণভাবে এক লেয়ার থেকে অন্য লেয়ারে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। জাগো নিউজকে তিনি বলেন, ‘বিদেশি কোম্পানি এলেই চারটা লেয়ারে তো একসাথে পারবে না। কোনো ক্রস ইনভেস্টমেন্ট অ্যালাউ করা হচ্ছে না শুধু একটা জায়গা ছাড়া, সেটা হচ্ছে ইনফ্রাস্ট্রাকচার।’

তিনি বলেন, ‘দেশি হোক, বিদেশি হোক, এক লেয়ার থেকে আরেক লেয়ারে যেতে পারবে না। শুধু পারবে ইনফ্রাস্ট্রাকচারের ক্ষেত্রে। কারণ ইনফ্রাস্ট্রাকচারেই ইনভেস্টমেন্ট সবচেয়ে বেশি দরকার।’

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বিদেশি ও দেশীয় উদ্যোক্তাদের জন্য ক্রস-ওনারশিপ ও একাধিক স্তরে বিনিয়োগের বিধান স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা না হলে ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে অসম পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তাই চূড়ান্ত নীতিমালা ও সংশ্লিষ্ট গাইডলাইনে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অধিকার ও সীমা স্পষ্ট করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

আরও পড়ুন

সাড়ে ৬৫ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে উচ্চগতির ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট

নতুন কাঠামোয় চার শ্রেণির লাইসেন্স

নতুন খসড়ায় বর্তমান লাইসেন্স কাঠামোর পরিবর্তে চারটি শ্রেণির লাইসেন্স চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে। এগুলো হলো—মোবাইল ও ব্রডব্যান্ড অ্যাক্সেস সেবা (এএনএসপি), টাওয়ার ও জাতীয় ফাইবার অবকাঠামো (এনআইসিএসপি), সাবমেরিন কেবল ও আন্তর্জাতিক গেটওয়ে (আইসিএসপি) এবং স্যাটেলাইটভিত্তিক সেবা (এনটিএনএসপি)।

নতুন কাঠামোর লক্ষ্য মধ্যবর্তী লাইসেন্সের স্তর কমানো, লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া সহজ করা এবং প্রযুক্তিনিরপেক্ষ ব্যবস্থা চালু করা। একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর লাইসেন্সের পরিবর্তে সেবাভিত্তিক ও প্রযুক্তিনিরপেক্ষ লাইসেন্স দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। তবে প্রস্তাবিত এই নতুন স্তরবিন্যাস নিয়েও খাতসংশ্লিষ্টদের মধ্যে আপত্তি রয়েছে।

মাইগ্রেশনের চাপে ছোট আইএসপি, রিসেলার মডেলেও আপত্তি

নতুন খসড়ায় আইএসপি খাতে বিদ্যমান চার ক্যাটাগরির পরিবর্তে জেলা ও নেশনওয়াইড—এই দুই ক্যাটাগরির লাইসেন্স রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে বর্তমান থানা বা উপজেলা পর্যায়ের আইএসপিকে জেলা এবং বিভাগীয় পর্যায়ের আইএসপিকে নেশনওয়াইড পর্যায়ে মাইগ্রেশনের প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি ছোট অপারেটরদের জন্য মাইগ্রেশন, একীভূত হওয়া বা রিসেলার হিসেবে কাজ করার সুযোগ রাখার কথা বলা হয়েছে। তবে রিসেলার মডেলসহ নতুন কাঠামো নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে আইএসপিএবি।

জানতে চাইলে আইএসপিএবি সভাপতি মোহাম্মদ আমিনুল হাকিম জাগো নিউজকে বলেন, ‘বর্তমানে আইএসপি লাইসেন্সের চারটি ক্যাটাগরি রয়েছে। নতুন প্রস্তাবে থানা বা উপজেলা ক্যাটাগরিকে জেলা এবং বিভাগীয় পর্যায়কে নেশনওয়াইডে নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু এতে বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন। একটি বিভাগে ১০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা প্রতিষ্ঠানের নেশনওয়াইড হতে ১৫০-২০০ কোটি টাকা লাগতে পারে, যা এক বছরে সম্ভব নয়। তাই ২০৩০-৩২ সালের মধ্যে মাইগ্রেশনের রোডম্যাপ দেওয়া উচিত। পাশাপাশি অন্তত পাঁচ বছর বর্তমান লাইসেন্স কাঠামোয় ব্যবসার সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন, যাতে উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ ও ফান্ডের প্রস্তুতি নিতে পারেন।’

রিসেলার মডেল নিয়েও আপত্তি জানিয়ে আইএসপিএবি সভাপতি বলেন, ‘রিসেলার বা ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেল নিয়ে আমাদের আপত্তি রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রথমদিকে এই মডেল চালুর প্রস্তাব ছিল। আমাদের আন্দোলন ও অনুরোধের পর বিটিআরসি সেটি বাদ দেয় এবং মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করে। কিন্তু বর্তমানে আবার রিসেলার অপশন চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এটিতে আমাদের জোরালো আপত্তি রয়েছে।’

তিনি বলেন, রিসেলার মডেলে নির্দিষ্ট এলাকায় একচেটিয়া ব্যবসার সুযোগ তৈরি হয় ও মূল্য বাড়ানোর ঝুঁকি থাকে। কেবল টিভির মতো একজন রিসেলার কোনো এলাকায় আধিপত্য তৈরি করে এক হাজার টাকার সেবা দুই হাজার টাকায় বিক্রি করতে পারে, আবার অতিরিক্ত ইনস্টলেশন ফিও নিতে পারে। এতে বিটিআরসির নির্ধারিত সাশ্রয়ী মূল্যের ইন্টারনেট এবং ‘এক দেশ এক রেট’ উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হবে।

আরও পড়ুন

আইএসপিএবি / নতুন নীতিমালা বাস্তবায়ন হলে ইন্টারনেটের দাম বাড়বে ২০ শতাংশ

এক ফাইবারে একাধিক আইএসপি, বাড়ছে অবকাঠামো ভাগাভাগির সুযোগ

নতুন খসড়ায় একটি ফাইবার অবকাঠামো একাধিক আইএসপির ব্যবহারের সুযোগ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ কোনো এলাকায় একটি ফাইবার নেটওয়ার্ক তৈরি হলে বাণিজ্যিক চুক্তির মাধ্যমে একাধিক লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠান সেটি ব্যবহার করে সেবা দিতে পারবে। এতে নতুন করে অবকাঠামো তৈরির প্রয়োজন কমায় আইএসপিগুলোর ব্যয় কমতে পারে।

খসড়ায় কমন অ্যাকসেস নেটওয়ার্কের প্রস্তাবও রয়েছে। পাশাপাশি আইএসপিকে তিন কিলোমিটার পর্যন্ত নিজস্ব লাস্ট-মাইল অবকাঠামো তৈরির সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এনআইসিএসপি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সাড়া না দিলে তা ‘নো অবজেকশন’ হিসেবে গণ্য করার প্রস্তাবও রয়েছে।

এছাড়া প্রতিটি পপের (পয়েন্ট অব প্রেজেন্স) জন্য এনআইসিএসপির মাধ্যমে অন্তত একটি রিডানডেন্ট ট্রান্সমিশন রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে একটি ফাইবারে সমস্যা বা বিচ্ছিন্নতা দেখা দিলে বিকল্প পথে ইন্টারনেট সেবা চালু রাখার সুযোগ তৈরি হবে।

খসড়ায় ব্রডব্যান্ড সংযোগ বিস্তারের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে দেশে প্রায় এক কোটি ৪৫ লাখ ব্রডব্যান্ড গ্রাহকের বিপরীতে প্রায় চার কোটি ১০ লাখ পরিবার রয়েছে। এছাড়া প্রায় চার হাজার ৫৫০ ইউনিয়নে সংযোগ পৌঁছানোর প্রয়োজন রয়েছে। ফলে শুধু জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে নয়, ইউনিয়ন পর্যায়েও ব্রডব্যান্ড অবকাঠামো সম্প্রসারণের লক্ষ্য রয়েছে নতুন কাঠামোয়।

ইএইচটি/এমএমএআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন jagofeature@gmail.com ঠিকানায়।