পুরোনো ধারায় জনপ্রশাসন, নিয়োগ-পদোন্নতিতে পিছু ছাড়ছে না বিতর্ক
বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হচ্ছে রোববার (১৬ আগস্ট)। তবে, সরকারের প্রথম ছয় মাসে জনপ্রশাসনে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের দৃশ্যমান ছাপ পড়েনি। প্রশাসনকে দক্ষ, নিরপেক্ষ ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার প্রত্যাশা থাকলেও নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ এবং কর্মকর্তাদের ওএসডি করে রাখার মতো পুরোনো ধারাই রয়ে গেছে অনেক ক্ষেত্রে।
বরং সরকারের প্রথম বড় পদোন্নতিতেই অবসরপ্রাপ্ত ও বিতর্কিত কর্মকর্তার নাম আসা, বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিয়োগ দিয়ে আবার বাতিল করার মতো ঘটনা দেখা গেছে। পাশাপাশি জেলা প্রশাসক বদলি ও নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন, বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তাকে দায়িত্বহীন রাখা এবং ব্যয় সংকোচনের উদ্যোগ থেকে পিছু হটার ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে।
গত ছয় মাসে জনপ্রশাসনের বড় পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে ১৭৯ জন উপ-সচিবকে যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি, বিভিন্ন পর্যায়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ, গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা আগের সরকারের কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেওয়া ও ৩২ জন সাবেক জেলা প্রশাসককে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো। এর পাশাপাশি কর্মকর্তাদের গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নিয়েও শেষ পর্যন্ত পিছু হটেছে সরকার। বিতর্কের জন্ম দিয়েছে বাংলাদেশ টেলিভিশনের মহাপরিচালক নিয়োগ সংক্রান্ত আইন নিয়েও।
প্রায় দুই দশক পর রাষ্ট্রক্ষমতায় ফেরা বিএনপির এই সরকারের কাছে প্রত্যাশা তৈরি হয় প্রশাসনকে আরও কার্যকর, দক্ষ ও জনবান্ধব করার। বিশেষ করে দীর্ঘদিনের রাজনীতিকীকরণ, পদায়ন ও পদোন্নতিতে অনিয়ম এবং প্রশাসনে কর্মকর্তাদের দলীয় পরিচয়ের প্রভাব কমানোর প্রত্যাশা ছিল।
কিন্তু, এসব ঘটনায় প্রশাসনে সংস্কারের বদলে পুরোনো ব্যবস্থার ধারাবাহিকতাই বজায় রয়েছে বলে মনে করছেন সাবেক আমলা ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ। তাদের মতে, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, মেধা ও দক্ষতাভিত্তিক প্রশাসন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এখনো বড় ধরনের পরিবর্তন চোখে পড়ছে না। তবে, কেউ কেউ মনে করেন একটি সরকারকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ৬ মাস খুবই অল্প সময়। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ছয় মাসের কার্যক্রম নিয়ে তারা সন্তুষ্ট এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে।
এ বিষয়ে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী জাগো নিউজকে বলেন, আমরা আমাদের ছয় মাসের অগ্রগতি নিয়ে সন্তুষ্ট। সবক্ষেত্রেই অগ্রগতি ভালো। কোথাও কোথাও অগ্রগতি শতভাগের চেয়ে বেশি।

ছয় মাসে সরকার ভিন্ন কিছু দেখাতে পারেনি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করে বিএনপি। ওইদিন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। একই অনুষ্ঠানে ২৫ জন মন্ত্রী ও ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী শপথ নেন। এর মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীসহ ৫০ সদস্যের মন্ত্রিসভা নিয়ে যাত্রা শুরু হয় নতুন সরকারের।
প্রথম বড় পদোন্নতিতেই বিতর্ক
ক্ষমতায় আসার প্রায় পাঁচ মাসের মাথায় প্রশাসনে ১৭৯ জন উপ-সচিবকে যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি দেয় সরকার। ৯ জুলাই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি হয়। নতুন সরকারের আমলে এটিই ছিল প্রশাসনে প্রথম বড় ধরনের পদোন্নতি। পদোন্নতির তালিকায় ছিল অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, শাস্তিপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিতর্কিত ভূমিকায় থাকা কয়েকজন কর্মকর্তার নাম। বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয় প্রশাসনে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব, জনপ্রশাসন সচিবসহ চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া সিনিয়র সচিব, সচিব ও সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা রয়েছেন ২২ জন। এর বাইরে গত ২৩ জুলাই নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিবসহ গ্রেড-২ পদমর্যাদার আরও ১২টি গুরুত্বপূর্ণ পদে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের উপ-সচিব মো. মাইনুল হক ভুঁইয়া অবসরে গেলেও যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতির তালিকায় ছিল তার নাম। পরে বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা হলে তার পদোন্নতির আদেশ বাতিল করে সরকার।
পদোন্নতির তালিকায় নাম ছিল ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অঞ্চল-৫-এর সাবেক আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা ছাদেকুর রহমানেরও। অথচ, গত ঈদুল আজহার পর রাজধানীতে কোরবানির বর্জ্য অপসারণে অবহেলার অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল তার বিরুদ্ধে। এমন আরও কয়েকজন কর্মকর্তা ছিলেন এ তালিকায়।
পদোন্নতির তালিকা তৈরির প্রক্রিয়ায় এমন ভুল কীভাবে হলো, তা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। এতে পদোন্নতির ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাই, স্বচ্ছতা ও প্রশাসনিক সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।
সিলেটের ডিসি সরানো-নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক
গত ২১ জুন সিলেটের জেলা প্রশাসক (ডিসি) সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়। সিলেটের হযরত শাহজালাল (রহ.) ও শাহপরাণ (রহ.) মাজারের আয়-ব্যয়ে স্বচ্ছতা আনতে তিনি কয়েকটি উদ্যোগ নিয়েছিলেন। মাজারের তিনটি ডেগ সিলগালা এবং নতুন দানবাক্স বসানোর উদ্যোগের মধ্যেই তাকে সরিয়ে দেওয়ায় বিষয়টি নিয়ে তৈরি হয় সমালোচনা।
এক সপ্তাহের মাথায় সিলেটের নতুন জেলা প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পান কুমিল্লার ডিসি রেজা হাসান। একই সময়ে কুমিল্লার নতুন জেলা প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব রোজী আকতারকে।
রেজা হাসানের ১ জুলাই সিলেটে যোগ দেওয়ার কথা ছিল। সিলেটে যাওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও যান। পরে রহস্যজনক কারণে তাকে ফিরিয়ে আনা হয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের নির্দেশে তাকে ফিরে আসতে হয় বলে উল্লেখ করা হয় বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে। পরে সিলেটে আর যোগ দিতে পারেননি রেজা হাসান।
এরপর ৯ জুলাই সিলেটের নতুন জেলা প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের উপ-সচিব আব্দুল্লাহ আল মামুনকে।
গত ২৪ মার্চ মো. আব্দুর রশীদ মিয়াকে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রধান প্রকৌশলী পদে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। চারদিন পর তার সেই নিয়োগ বাতিল করা হয়।
চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বেড়েছে, সরানো হয়েছে আগের কর্মকর্তাদের
বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বেড়েছে প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ। চুক্তিতে নিয়োগ বাড়ায় নিয়মিত কর্মকর্তাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে অসন্তোষ। বর্তমানে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, জনপ্রশাসন সচিবসহ চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া সিনিয়র সচিব, সচিব ও সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা রয়েছেন ২২ জন। এর বাইরে গত ২৩ জুলাই নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিবসহ গ্রেড-২ পদমর্যাদার আরও ১২টি গুরুত্বপূর্ণ পদে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়।
প্রশাসনকে যথাযথ পরিচালনার জন্য সরকারের যে কর্মপরিকল্পনা নেওয়া দরকার ছিল, সরকার তা ভালোভাবে নিতে পারেনি। ফলে প্রশাসনে অস্থিরতা ও অদক্ষতা আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে প্রশাসন এখনো রাজনীতিকীকরণ থেকে মুক্ত হতে পারেনি।— জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া
কর্মকর্তাদের অভিযোগ, অবসরে যাওয়া এবং বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বা মতাদর্শে বিশ্বাসী কর্মকর্তাদের এসব পদে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। একই সময়ে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে আগের সরকারের আমলে গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা বেশিরভাগ কর্মকর্তাকে। অনেককে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছে, আবার কাউকে ওএসডি বা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত রাখা হয়েছে।
২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করা তৎকালীন ৩২ জেলা প্রশাসককে গত ২৭ জুলাই বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায় সরকার। এছাড়া, ওএসডি ও সংযুক্ত হিসেবে রয়েছেন প্রশাসন ক্যাডারের ৭১৪ কর্মকর্তা। তাদের কোনো প্রশাসনিক দায়িত্ব না থাকলেও বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা বাবদ প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৫ কোটি ৭৩ লাখ ১২ হাজার টাকা ব্যয় হচ্ছে।
এতে একদিকে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় হচ্ছে। অন্যদিকে দীর্ঘ প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতায় গড়ে ওঠা দক্ষ জনবলকে কাজে না লাগিয়ে অপচয় হচ্ছে প্রশাসনিক সক্ষমতারও।
গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নিয়েও পিছু হটা
সরকারি ব্যয় কমানোর উদ্যোগ হিসেবে গত ৯ জুলাই অর্থ বিভাগ থেকে গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় অর্ধেক করার বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের কাছে চিঠি পাঠানো হয়। চিঠিতে উপ-সচিব থেকে সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় মাসিক ৫০ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে ২৫ হাজার টাকা করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার কথা উল্লেখ করা হয়।
কিন্তু, কর্মকর্তাদের বাধার মুখে শেষ পর্যন্ত এ উদ্যোগ থেকে পিছু হটে সরকার। উপ-সচিব থেকে সচিব পর্যন্ত কর্মকর্তাদের গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় কমেনি। মাসে ৫০ হাজার টাকা করেই এ ব্যয় বহাল রয়েছে।
বিটিভির ডিজি নিয়োগের আইন নিয়ে সমালোচনা
বাংলাদেশ টেলিভিশনের নতুন মহাপরিচালক নিয়োগের আইনি প্রক্রিয়া নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন। গত ৬ আগস্ট ‘বাংলাদেশ টেলিভিশন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০০১’-এর আলোকে বিটিভির ডিজি নিয়োগ দেওয়া হয় গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব কাজী জেসিনকে। অকার্যকর আইনে তাকে এ নিয়োগ দেওয়া হয়।
বিটিভির স্বায়ত্তশাসনের উদ্দেশ্যে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আইনটি জাতীয় সংসদে পাস হলেও আইনটি কার্যকর করার ক্ষেত্রে সরকার গেজেট নোটিফিকেশন জারি করবে বলে আইনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু গত ২৫ বছরে আইনটি কার্যকর করতে কোনো সরকারই এ ধরনের প্রজ্ঞাপন জারি করেনি। অর্থাৎ, আইনটি সংসদে পাস হলেও এখনো কার্যকর হয়নি বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। অথচ ওই আইনের রেফারেন্স দিয়েই নতুন ডিজি নিয়োগ দিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এতে নিয়োগের আইনি ভিত্তি এবং মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন।
কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা
বর্তমান সরকারের ছয় মাসের প্রশাসনিক কার্যক্রম মূল্যায়ন করতে গিয়ে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া জাগো নিউজকে বলেন, প্রশাসনে কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হয়নি। গণতান্ত্রিক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রশাসন গতি ফিরে পাবে, দক্ষতা ও যোগ্যতা বাড়বে এবং রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা আসবে বলে যে প্রত্যাশা ছিল, তা পূরণ হয়নি।
প্রশাসনে কর্মকর্তাদের কাজ করার স্বাধীনতা থাকা দরকার। রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি প্রতিটি প্রশাসনিক বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে, তাহলে কর্মকর্তাদের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ থাকে না।— জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রধান আব্দুল মুয়ীদ চৌধুরী
তিনি বলেন, বরং প্রশাসন আগের চেয়ে আরও দুর্বল হচ্ছে এবং অস্থিরতা বিরাজ করছে। প্রশাসনকে যথাযথ পরিচালনার জন্য সরকারের যে কর্মপরিকল্পনা নেওয়া দরকার ছিল, সরকার তা ভালোভাবে নিতে পারেনি। ফলে প্রশাসনে অস্থিরতা ও অদক্ষতা আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে প্রশাসন এখনো রাজনীতিকীকরণ থেকে মুক্ত হতে পারেনি।
তবে ছয় মাস খুব বেশি সময় নয় উল্লেখ করে মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া বলেন, সরকার এখনো চাইলে প্রশাসনকে ঢেলে সাজানোর জন্য সঠিক কর্মপরিকল্পনা নিতে পারে। নিরপেক্ষ, দক্ষ ও স্বচ্ছ প্রশাসন গড়ে তুলতে কার্যকর পরিকল্পনা নেওয়া হলে ভবিষ্যতে আশার আলো দেখা যেতে পারে।
কথা হয় জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রধান, সাবেক সচিব ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আব্দুল মুয়ীদ চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি অবশ্য ছয় মাসে সরকারের প্রশাসনিক কার্যক্রমের চূড়ান্ত মূল্যায়নের পক্ষে নন। জাগো নিউজকে আব্দুল মুয়ীদ চৌধুরী বলেন, ছয় মাস একটি সরকারের প্রশাসনিক কার্যক্রম মূল্যায়নের জন্য খুবই কম সময়। আরও অন্তত ছয় মাস যাওয়ার পর বোঝা যাবে তারা কী ধরনের কাজ করছে এবং কতটা অর্জন করতে পারছে।
তিনি বলেন, শেখ হাসিনা সরকারের দীর্ঘ সময়ের পর এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে কিছুটা হ-য-ব-র-ল পরিস্থিতির পর ছয় মাসের মধ্যে একটি সরকারকে মূল্যায়ন করা ঠিক হবে না।
প্রশাসনে কর্মকর্তাদের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ থাকা উচিত জানিয়ে আব্দুল মুয়ীদ চৌধুরী বলেন, আমি যখন ফরিদপুর ও ঢাকার ডিসি ছিলাম, তখন অনেক কাজ স্বাধীনভাবে করার সুযোগ পেয়েছি। সরকারের যেসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন, সেগুলো করতাম। এর বাইরে নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগও ছিল।
তিনি আরও বলেন, প্রশাসনে কর্মকর্তাদের কাজ করার স্বাধীনতা থাকা দরকার। রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি প্রতিটি প্রশাসনিক বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে, তাহলে কর্মকর্তাদের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ থাকে না।
জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের শিক্ষার্থী প্রতিনিধি সদস্য মেহেদী হাসানও বলেছেন প্রশাসনে মৌলিক পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথা। জাগো নিউজকে তিনি বলেন, এই সরকারকে আমরা গণঅভ্যুত্থানের সরকার হিসেবেই বিশ্বাস করি। তাই গণঅভ্যুত্থানের যে আকাঙ্ক্ষা ছিল, সেই সিস্টেমেটিক পরিবর্তনগুলো হওয়া উচিত।

সিলেটের ডিসি সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহার
মেহেদী হাসান বলেন, পুরোনো বস্তাপচা নিয়ম-কানুনের ধারাবাহিকতা থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে। আমরা এখনো অনেক ক্ষেত্রে রোগের চিকিৎসা না করে রোগের উপসর্গের চিকিৎসা করছি। মূল জায়গায় গিয়ে সমস্যাটাকে খতিয়ে দেখতে হবে।
তিনি মনে করেন, প্রশাসন ও রাজনীতির দীর্ঘদিনের যোগসাজশ ভাঙতে রাজনৈতিক নেতৃত্বের দৃঢ় ইচ্ছা প্রয়োজন। শুধু সংস্কার কমিশনের সুপারিশ দিয়ে এই পরিবর্তন সম্ভব নয়।
ব্যুরোক্রেসি ও পলিটিক্স যখন এক হয়ে যায়, তখনই মূল সমস্যাটা তৈরি হয়। এই জায়গাটা ভাঙতে রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রয়োজন। একজন রাজনীতিবিদ বা সরকার যদি সত্যিই চায় যে এই ব্যবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে হবে, তাহলে পরিবর্তন সম্ভব, বলেন গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয় অংশ নেওয়া জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের এ শিক্ষার্থী।
আরএমএম/কেএসআর





