শিক্ষা প্রকৌশলের ঢাকা মেট্রো কার্যালয়ে অর্থ লেনদেন, নেপথ্যে কী
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) ঢাকা মেট্রো সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. হাসান শওকতের অফিস কক্ষে টাকা লেনদেনের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। এ নিয়ে একাধিক সংবাদ প্রকাশ হয়েছে বিভিন্ন গণমাধ্যমে। বিষয়টি নিয়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে শিক্ষা প্রশাসনেও।
তবে, অর্থ লেনদেনের চাঞ্চল্যকর এ ভিডিওর বিষয়ে খোঁজ নিয়ে মিলেছে ভিন্ন তথ্য। জানা গেছে, ভিডিওটি ২০২২ সালের ২৬ মে’র। সেসময় হাসান শওকত ছিলেন ঢাকা মেট্রো সার্কেলের নির্বাহী প্রকৌশলী। ভিডিওতে যাদের দেখা যাচ্ছে, তারা দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক ও প্রতিনিধি। টাকা লেনদেন হয়েছে তাদের দুই পক্ষের মধ্যে। দরপত্র জমা দিয়ে পাওয়া একটি কাজ ও জামানতের অর্থ হস্তান্তরের প্রক্রিয়ার চিত্র ধারণ করা হয় ওই ভিডিওতে।
ঢাকা মেট্রো অফিসে কী ঘটেছিল সেদিন
ভিডিওতে টাকা লেনদেন করা দুই পক্ষ, উপস্থিত শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলেছে জাগো নিউজ। তাদের দেওয়া তথ্যমতে, দরপত্রের মাধ্যমে সরকারি বাঙলা কলেজের ভবনের একটি কাজ পায় ঢালী কনস্ট্রাকশন লিমিটেড। কাজটি ৪ কোটি ৮০ লাখ টাকার। এ টাকার জামানত বা পারফরম্যান্স গ্যারান্টি ৫ শতাংশ, যা প্রায় ২৪ লাখ টাকা।
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্র জানায়, কাজ পাওয়া ঢালী কনস্ট্রাকশন নামের প্রতিষ্ঠানটি ছিল ঋণখেলাপি। পরে প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করে। এতে আটকে যায় বাঙলা কলেজের ভবনের কাজ। পরে কাজটি এগিয়ে নিতে উদ্যোগ নেয় শিক্ষা প্রকৌশলের ঢাকা মেট্রো সার্কেল।

ঢালী কনস্ট্রাকশন ও মিরন এন্টারপ্রাইজের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তিপত্র
ঢালী কনস্ট্রকাশন দেউলিয়া হওয়ায় তৎকালীন যুবলীগ নেতা রাকিব হোসেন মিরনের প্রতিষ্ঠান ‘মিরন এন্টারপ্রাইজ’ তৃতীয়পক্ষ হয়ে কাজটির বাকি অংশ শেষ করার বিষয়ে চুক্তিপত্র করতে আগ্রহী হয়। ঢালী কনস্ট্রকাশন সেসময় শর্ত দেয় যে, কাজ পাওয়ার সময় নিয়ম অনুযায়ী তারা যে পারফরমেন্স গ্যারান্টির (পিজি) টাকা ব্যাংকে জমা দিয়েছিলেন— তা তাদের পরিশোধ করতে হবে।

ওপারে ‘অদৃশ্য চোখ’, এপারে উঠানেও আতঙ্ক
একই সঙ্গে ঢালী কনস্ট্রাকশনের মালিক বিষয়টিতে সাক্ষী রাখতে চান শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের। কারণ, যুবলীগ নেতা মিরন রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী হওয়ায় পরে পিজি বা জামানতের টাকা না পাওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করেন। এ কারণে শিক্ষা প্রকৌশলের কর্মকর্তাদের সাক্ষী রেখে কাজ ও জামানতের এ অর্থ হস্তান্তর চুক্তিতে সই করা হয়। বিষয়টির প্রমাণ রাখতে মিরনের পক্ষে মিরন এন্টারপ্রাইজের কর্মচারী ইকবাল হোসেন ভিডিও ধারণ করে রাখেন। গোপনে নয়, প্রকাশ্যেই ভিডিওটি ধারণ করা হয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
ভিডিওতে থাকা ব্যক্তিরা যা বললেন
ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, অফিস কক্ষে বসে আছেন একজন কর্মকর্তা। তিনি হাসান শওকত, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ঢাকা মেট্রো সার্কেলের তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী (বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী)। তার সামনে তিনজন বসা। মাঝের দুজনের মধ্যেই হয় অর্থ লেনদেন।
ঢালী কনস্ট্রাকশন যে পারফরমেন্স গ্যারান্টির টাকা জমা দিয়েছিল, সেটা তারা দ্রুত তুলে নিতে চাচ্ছিলেন। সেটার পরিমাণ প্রায় ২৪ লাখ টাকা। তার মধ্যে ৫ লাখ টাকা আমরা চুক্তির দিনে তাদের হাতে তুলে দিই। টাকা নিয়ে পরে যেন আবার অস্বীকার করতে না পারে সেজন্য ভিডিও করে রাখা হয়।— মিরন এন্টারপ্রাইজের মালিক রাকিব হোসেন মিরন
তাদের মধ্যে সাদা শার্ট পরা ফিরোজ আহমেদ। তিনি ঢালী কনস্ট্রাকশনের পরিচালক। টাকাটা গ্রহণ করেন ফিরোজ আহমেদ। আর যিনি দিচ্ছেন, তিনি রাকিব হোসেন মিরন। মিরন এন্টারপ্রাইজের মালিক। তার পরনে চেক শার্ট। পেছনে একজন দাঁড়ানো। আরেকজন ভিডিও ধারণকারী।
কথা হয় রাকিব হোসেন মিরনের সঙ্গে। টাকা দেওয়ার বিষয়ে জাগো নিউজকে তিনি বলেন, ‘ঢালী কনস্ট্রাকশন দেউলিয়া হওয়ায় কাজ করতে পারছিল না। তখন শিক্ষা প্রকৌশল থেকে আমাদের বিষয়টি নিয়ে অ্যাপ্রোচ করা হয়। এ ধরনের কাজে খুব বেশি লাভ হয় না। তারপরও কর্মকর্তাদের অনুরোধে কাজটি নিয়েছিলাম আমরা। অর্থাৎ, আমরা তৃতীয়পক্ষ। সেই কাজের অবশিষ্ট অংশ শেষ করতে এবং বিল যেন আমাদের অ্যাকাউন্টে আসে, সেজন্য লিখিত চুক্তি করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, সেসময় ঢালী কনস্ট্রাকশন যে পারফরমেন্স গ্যারান্টির টাকা জমা দিয়েছিল, সেটা তারা দ্রুত তুলে নিতে চাচ্ছিলেন। সেটার অ্যামাউন্ট (পরিমাণ) প্রায় ২৪ লাখ টাকা। তার মধ্যে ৫ লাখ টাকা আমরা চুক্তির দিনে তাদের হাতে তুলে দিই। টাকা নিয়ে পরে যেন আবার অস্বীকার করতে না পারে সেজন্য ভিডিও করে রেখেছিল আমার অফিসের ইকবাল নামে একটি ছেলে। সেই ভিডিও কীভাবে সোশ্যাল মিডিয়া বা মিডিয়ার হাতে গেলো, তা বলতে পারবো না। তবে এখানে কোনো অবৈধ লেনদেন বা ঘুস লেনদেন হয়নি। ভুল তথ্য প্রচার হয়েছে মিডিয়ায়।
একই কথা জানান ঢালী কনস্ট্রাকশনের পরিচালক ও টাকা গ্রহণ করা ফিরোজ আহমেদও। জাগো নিউজকে তিনি বলেন, মিরন তো যুবলীগের নেতা। সেসময় তারা পাওয়ারে। আমরা ভরসা পাচ্ছিলাম না যে জামানাতের টাকাটা পাবো। সেজন্য শিক্ষা প্রকৌশলের সেসময়ের নির্বাহী প্রকৌশলী হাসান শওকতের সামনে এ লেনদেন হয়। তাকে সাক্ষী রাখা হয়। তিনি কোনো টাকা নেননি।
দুই পক্ষ চুক্তি করছে, কাজ হস্তান্তর হয়েছে। তারাই একে অপরকে দিয়েছেন পিজির টাকা। কিন্তু বলা হচ্ছে, আমি ঘুস নিয়েছি। এটা একেবারে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। এটুকু বলতে পরি, তাদের থেকে এক পয়সাও আমি নিইনি। এটা কেউ প্রমাণও করতে পারবে না।— শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হাসান শওকত
জানতে চাইলে তৎকালীন শিক্ষা প্রকৌশলের ঢাকা মেট্রো সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী) হাসান শওকত জাগো নিউজকে বলেন, দুই পক্ষ চুক্তি করছে, কাজ হস্তান্তর হয়েছে। তারাই একে অপরকে দিয়েছেন পিজির টাকা। কিন্তু বলা হচ্ছে, আমি ঘুস নিয়েছি। এটা একেবারে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন।
কাজ হস্তান্তর প্রক্রিয়া ও সরকারি অফিসে এ ধরনের চুক্তিতে আইনি বাধা আছে কি না- এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অনেক কাজের ক্ষেত্রেই তৃতীয়পক্ষ কাজ শেষ করে। অহরহ এ ঘটনা ঘটছে। এক্ষেত্রে তো আইনের ব্যত্যয় হয় বলে আমার জানা নেই। অফিস কক্ষে আমার সামনে তাদের লেনদেন আইনে কোনো অপরাধ কি না, সেটাও আমার জানা নেই। তবে আমি এটুকু বলতে পরি, তাদের থেকে এক পয়সাও আমি নিইনি। এটা কেউ প্রমাণও করতে পারবে না।
আটতলা ভবনের ১০তলার বিল, ঘটনা কী
রাজধানীর শেরে বাংলা বালিকা মহাবিদ্যালয়ের ৮তলা ভবন নির্মাণ করা হলেও ১০তলা ভবনের বিল পরিশোধ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শেরে বাংলা বালিকা মহাবিদ্যালয়ে ১০তলা ভিত করা হয়েছিল। স্থাপনাটি কেপিআই আওতাভুক্ত ও বঙ্গভবনের নিরাপত্তাজনিত কারণে পরে ৮ তলা পর্যন্ত নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়।

ঠিকাদারদের অগ্রিম বিল পরিশোধে সতর্কতা অবলম্বন বিষয়ক চিঠি
তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, কাজটির দরপত্র মূল্য ছিল ২২ কোটি এক লাখ ৮৫ হাজার ৪৫০ টাকা। পরে সংশোধিত প্রাক্কলিত মূল্য দাঁড়ায় ১৯ কোটি ৪৯ লাখ ৮৬ হাজার ৮৫০ টাকা। সে অনুযায়ী ৮তলা ভবনের কাজ শেষে ১৫তম চলতি ও চূড়ান্ত বিল ঠিকাদার জমা দেয়। তাতে বিলের পরিমাণ ছিল ১৭ কোটি ৮৪ লাখ ১২ হাজার টাকা। নিরীক্ষা শেষে প্রথম থেকে ১৪তম বিলের ১৭ কোটি ২৭ লাখ ২৭ হাজার টাকা দেওয়া হয়। চূড়ান্ত বিল থেকে স্থগিত রাখা হয় ৮৫ হাজার টাকা। ফলে সেখানে নবম ও দশমতলার কাজের কোনো বিল পরিশোধ করা হয়নি।

‘১৭ বছর বঞ্চিত’ তদবিরে বিরক্ত আইজিপি
অগ্রিম বিল পরিশোধে ‘সতর্কতা’ অবলম্বনে চিঠি
অভিযোগ উঠছে, নির্বাহী প্রকৌশলী থাকাকালে হাসান শওকত ঠিকাদারদের অগ্রিম বিল পরিশোধে সহায়তা করেছেন। তবে ভিন্নচিত্র দেখা গেছে নথিপত্রে। ২০২৩ সালের ১৯ নভেম্বর ঢাকা মেট্রো সার্কেল ঠিকাদারদের অগ্রিম বিল পরিশোধে সতর্কতা অবলম্বনের জন্য একটি চিঠি দেয়। চিঠিতে অধীন কর্মকর্তাদের সতর্ক করা হয়। ওই চিঠিতে সই রয়েছে তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী হাসান শওকতের।
জানতে চাইলে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. তারেক আনোয়ার জাহেদী জাগো নিউজকে বলেন, বিষয়টি গণমাধ্যমে দেখেছি। সত্য-মিথ্যা জানি না। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে একটা কমিটি করা হবে।
এএএইচ/কেএসআর


