কয়লার রামপালে এবার সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র, ব্যয় আড়াই হাজার কোটি টাকা
বাগেরহাটের রামপালে কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের শুরু থেকেই পরিবেশগত ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ ও বিরোধিতা করে আসছেন দেশি-বিদেশি পরিবেশবাদীরা। সুন্দরবনের মাত্র ৯ কিলোমিটারের মধ্যে কেন্দ্রটি হওয়ায় কয়লার বর্জ্য, ছাই ও ধোঁয়ায় বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের উদ্ভিদ ও প্রাণিকুল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এবার সেই রামপালেই কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশে দেশের সর্ববৃহৎ পরিবেশবান্ধব সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করতে যাচ্ছে সরকার। দুই হাজার ৫০২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ৪৪২ মেগাওয়াট ক্ষমতার এ সোলার প্ল্যান্ট নির্মাণ করা হবে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিউবো) জানায়, সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে ১০ শতাংশ বা ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এ কারণে রামপালের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পটি সরকারের নীতি ও নির্বাচনি ইশতেহারের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি দেশের সৌরবিদ্যুৎ খাতেও এটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হবে।
‘কন্সট্রাকশন অব ৪৪২ মেগাওয়াট পিক (ডিসি) সোলার ফটোভোলটাইক গ্রিড-কানেক্টেড পাওয়ার প্ল্যান্ট অ্যাট ব্লক-বি, রামপাল’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হবে।
বিউবোর প্রস্তাবিত প্রকল্পের ওপর প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা করেছে পরিকল্পনা কমিশনের শিল্প ও শক্তি বিভাগ। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্যই এ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রকল্পে প্রতি মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা স্থাপনে নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।
বিউবো জানায়, প্রকল্পটির প্রস্তাবিত ব্যয় দুই হাজার ৫০২ কোটি টাকা। জুলাই ২০২৬ থেকে ডিসেম্বর ২০২৬ মেয়াদে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রকল্প ব্যয়ের মধ্যে ৩৭৫ কোটি টাকা বিউবোর নিজস্ব তহবিল থেকে এবং বাকি ২ হাজার ১২৭ কোটি টাকা ‘বিদ্যুৎ খাত উন্নয়ন তহবিল’ থেকে ২ শতাংশ সুদে সহায়তা হিসেবে পাওয়া যাবে।
২০২৫ সালের মে মাসে প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন করে ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন কোম্পানি। সমীক্ষায় ৬৮৫ একর জমিতে ৪৪২ মেগাওয়াট সক্ষমতার একটি গ্রিড-সংযুক্ত সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সুপারিশ করা হয়। সমীক্ষা প্রতিবেদনে প্রকল্পটিকে গ্রহণযোগ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
চলতি অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) অননুমোদিত নতুন প্রকল্পের তালিকায়ও প্রকল্পটি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে নতুন করে জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হবে না। এছাড়া প্রকল্পে বিদেশি অর্থায়ন না থাকায় অর্থ বিভাগের সুপারিশেরও প্রয়োজন নেই বলে জানিয়েছে অর্থ বিভাগ।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড জানায়, বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের লক্ষ্যে ২০১২ সালে বাগেরহাটের রামপালে মোট ১ হাজার ৮৩৪ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। জমিটি ব্লক-এ ও ব্লক-বি- এ দুটি অংশে বিভক্ত।
এর মধ্যে ব্লক-এ অংশে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ উদ্যোগে মৈত্রী সুপার থার্মাল বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে। আর ব্লক-বি অংশটি বর্তমানে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিউবো) অধীনে রয়েছে। সেখানে ভূমি উন্নয়নসহ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিমূলক কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।
ব্লক-বিতে বিউবোর অধীনে রয়েছে ৯১৮ দশমিক ৫০ একর জমি। এর মধ্যে ৭৬ দশমিক ৬৩ একর গ্রিন বেল্ট, ২৩ দশমিক ৮৭ একর ফ্লাড প্রটেকশন ইমব্যাংকমেন্ট, ১২ একর দিঘি ও ৩০ একর লেক রয়েছে। এসব বাদ দিয়ে ব্যবহারযোগ্য ৬৮৫ একর জমিতে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা সম্ভব হবে।
প্রকল্পের জন্য নতুন করে জমি কেনা বা উন্নয়নের প্রয়োজন না থাকায় এর ব্যয়ও তুলনামূলক কম হবে। ‘বিদ্যুৎ খাত উন্নয়ন তহবিল’ থেকে ২ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়ার বিষয়ে অর্থ বিভাগের সম্মতি রয়েছে। এদিকে, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে চলতি বছরের ৩ জুন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীর নীতিগত সম্মতিও পাওয়া গেছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশে ৪৪২ মেগাওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পটি পুরোপুরি দেশীয় অর্থায়নে বাস্তবায়ন করা হবে।
রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশে ৪৪২ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। উন্নয়ন সহযোগীদের আপত্তির কারণে প্রকল্পটি পুরোপুরি দেশীয় অর্থায়নে বাস্তবায়ন করা হবে।— বিউবোর সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম
তিনি বলেন, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ নিয়ে উন্নয়ন সহযোগীদের আপত্তি থাকায় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পটি দেশীয় অর্থায়নে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি নিয়ে এরই মধ্যে পিইসি সভা হয়েছে এবং পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনও পাওয়া গেছে।
পরিকল্পনা কমিশনের শিল্প ও শক্তি বিভাগের সদস্য (সচিব) ড. মোহাম্মদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। সভায় প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে কয়েকটি সুপারিশ দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্প বাস্তবায়নে ১৩ জন কর্মকর্তা ও একজন কর্মচারী প্রেষণে এবং ১১ জন কর্মী আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এছাড়া প্রকল্প শেষে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনায় ২৫৬ জন জনবলের প্রয়োজন হবে। এজন্য বছরে প্রায় ৯ কোটি ৫৬ লাখ টাকা ব্যয় হবে। প্রকল্প শেষে প্রয়োজনীয় জনবলের বিবরণ, জনবল কাঠামো, কারিগরি জনবলের তথ্য, বার্ষিক বাজেট এবং এসব ব্যয় কীভাবে নির্বাহ করা হবে- সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দেওয়ার বিষয়ে সভায় সবাই একমত পোষণ করেন।
প্রস্তাবিত প্রকল্পের বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশন জানায়, প্রকল্পটি নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়িত হবে। তাই স্থানীয় পরামর্শকদের কাজের সুযোগ আরও বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।
প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনায় (ডিপিপি) বৈদ্যুতিক ব্যয়, কমিশনিং ও অন্যান্য খাতে ৬৬ লাখ ৬০ হাজার টাকা, সম্মানী ২৪ লাখ ৬১ হাজার টাকা, আপ্যায়ন ১৬ লাখ ৬৫ হাজার টাকা, স্টেশনারি ৩১ লাখ টাকা, কম্পিউটার উপকরণ ২২ লাখ টাকা, কম্পিউটার ১২ লাখ টাকা এবং আসবাবপত্র খাতে ২১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছিল। পিইসি সভায় এসব খাতে প্রস্তাবিত ব্যয় যৌক্তিকভাবে কমিয়ে আনার সুপারিশ করা হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের শিল্প ও শক্তি বিভাগের সিনিয়র সহকারী প্রধান (বিদ্যুৎ-২) শিবরাজ চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, ৪৪২ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের বিষয়ে পিইসি সভা হয়েছে। সভায় প্রকল্পের কয়েকটি ব্যয়ের খাত কমানোর মতামত দেওয়া হয়েছে।
সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের বিষয়ে পিইসি সভা হয়েছে। সভায় প্রকল্পের কয়েকটি ব্যয়ের খাত কমানোর মতামত দেওয়া হয়েছে। সংশোধনের জন্য প্রকল্পটি বিউবোর কাছে পাঠানো হয়েছে। সংশোধন শেষে একনেকে উপস্থাপনের প্রস্তুতি নেওয়া হবে।— পরিকল্পনা কমিশনের সিনিয়র সহকারী প্রধান (বিদ্যুৎ-২) শিবরাজ চৌধুরী
তিনি বলেন, বিউবোর কাছে প্রকল্পটি পাঠানো হয়েছে। বোর্ড প্রয়োজনীয় সংশোধন করে দিলে এরপর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপনের প্রস্তুতি নেওয়া হবে।
বিউবো জানায়, প্রকল্প বাস্তবায়নকালীন সময় ও প্রকল্প শেষে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার জন্য যানবাহনের প্রয়োজন হবে। বিভিন্ন স্থানে প্রকল্প বাস্তবায়ন ও পরবর্তী সময়ে প্ল্যান্ট পরিচালনায় যানবাহন ছাড়া কার্যক্রম চালানো কঠিন। তাই প্রকল্পের শুরুতেই যানবাহন সংগ্রহ করা হলে তা প্রকল্প শেষে প্ল্যান্ট পরিচালনার কাজেও ব্যবহার করা যাবে।
প্রকল্প বাস্তবায়নকালে ব্যবহারের জন্য একটি জিপ, একটি মাইক্রোবাস ও একটি পিকআপ বাজারদর যাচাই করে প্রকৃত ভাড়ায় ব্যবহারের সংস্থান রাখার বিষয়ে পিইসি সভায় একমত হওয়া হয়। তবে সহকারী ও উপসহকারী প্রকৌশলীদের জন্য ছয়টি মোটরসাইকেল কেনার প্রস্তাবে সম্মতি দেয়নি পরিকল্পনা কমিশন।
অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সম্প্রসারণ, শিল্পায়ন, রপ্তানিমুখী ডিজিটাল শিল্পের বিকাশ, আইসিটি খাতের অগ্রগতি ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের কারণে দেশে প্রতি বছর বিদ্যুতের চাহিদা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে।
ইন্টিগ্রেটেড এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার মাস্টারপ্ল্যান ২০২৩ অনুযায়ী, ২০৩০, ২০৪১ ও ২০৫০ সালে দেশে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা দাঁড়াবে যথাক্রমে ২৯ হাজার ২৫৭, ৫৮ হাজার ৫৯৭ ও ৯৬ হাজার ৭৬৭ মেগাওয়াট।
অন্যদিকে, এখন পর্যন্ত দেশে সর্বোচ্চ ১৬ হাজার ৭৯৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের রেকর্ড রয়েছে, যা হয়েছে ২৩ জুলাই ২০২৫। দেশের শতভাগ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এলেও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা ও জ্বালানি নিরাপত্তার এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে বিউবো।
এমওএস/এমএএইচ/





