সার না পেয়ে গুদাম লুট, বাস্তবে সংকট কতটা?

নাজমুল হুসাইন
নাজমুল হুসাইন নাজমুল হুসাইন , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৭:২৫ পিএম, ২৪ আগস্ট ২০২৬
কৃষকের হাতে সার পৌঁছালেও মাঠপর্যায়ে সরবরাহ নিয়ে রয়েছে নানা অভিযোগ, ছবি: জাগো নিউজ

সার না পেয়ে কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে ডিলারের গুদামে ঢুকে সার নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় দেশের সার পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। রোববার (২৩ আগস্ট) সকালে সার না পাওয়ার অভিযোগে একদল কৃষক ওই গুদামে ঢুকে পড়েন। কৃষি বিভাগের হিসাবে, সেখান থেকে ২০২ বস্তা ইউরিয়া ও ২৩ বস্তা পটাশ সার নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

আমন মৌসুমে সার চাহিদা বাড়ার সময় এ ঘটনা ঘটায় মাঠপর্যায়ে সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে। এটি স্থানীয় সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা, নাকি কিছু কৃষক মব করে এটি করেছে, এমন বিষয় শুধু সামনে আনছে না, বরং সার নিয়ে মাঠপর্যায়ে প্রকৃত পরিস্থিতি কী- সেই প্রশ্নও জোরালো করছে।

সরকারের দাবি, দেশে পর্যাপ্ত সার রয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে বেশি। ডিলার ও ব্যবসায়ীদের একটি অংশ পরিকল্পিতভাবে সার নিয়ে নৈরাজ্য সৃষ্টি করছে। তারা এ ইস্যুতে পরিস্থিতি বিশৃঙ্খল করতে চায়।

আরও পড়ুন

কুড়িগ্রামে লুটের পর ৫৮ বস্তা সার উদ্ধার

তবে অনেক এলাকার কৃষকের সঙ্গে কথা বলে এও জানা যাচ্ছে, কাগজে-কলমে পর্যাপ্ত মজুত থাকলেও মাঠপর্যায়ে কৃষকরা প্রয়োজনের সময় সার পাচ্ছেন না। বাধ্য হয়ে তাদের সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দাম দিয়ে সার কিনতে হচ্ছে।

জয়পুরহাট, নওগাঁ, কুড়িগ্রাম, দিনাজপুর, শেরপুরসহ কয়েকটি জেলার কৃষক জাগো নিউজকে বলেছেন, তারা চাহিদা মতো সার পাচ্ছেন না। সারের জন্য তাদের ডিলার ও বিক্রয়কেন্দ্রে ঘুরতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে নেতাকর্মীর সুপারিশ ও ফোনের পরে সার মিলছে।

অনেক কৃষকের অভিযোগ, ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সার কিনতে কেজিপ্রতি ৪ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি দাম দিতে হচ্ছে। এতে ৫০ কেজির এক বস্তায় ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বেশি গুনতে হচ্ছে। আবার কয়েকজন কৃষক জানিয়েছেন, তারা এখনো সারই পাননি।

আরও পড়ুন

কুড়িগ্রামে সার লুটের ঘটনায় ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি, ১০০ বস্তা উদ্ধার

কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীর কৃষক মাসুম মিয়া বলেন, কয়েকটি দোকান ঘুরেও সার কিনতে পারিনি। কখনো দোকান বন্ধ, কখনো সার নেই, আবার কখনো বলা হচ্ছে বরাদ্দ নেই। এভাবে দিনের পর দিন ডিলারের দরজায় ঘুরছি।

জয়পুরহাট আক্কেলপুরের গণিপুর গ্রামের একজন কৃষক ফরিদ উদ্দিন বলেন, সার নেই বলে ডিলার প্রতি বস্তা ইউরিয়া ২০০ টাকা বেশি চাচ্ছে। সরকারি দামে এক বস্তা ইউরিয়া ১ হাজার ৩৫০ টাকা, চাচ্ছে ১ হাজার ৫৫০ টাকা। আগে ডিএপি সারের দাম বস্তাপ্রতি ৩৫০ টাকা বেশি দিয়ে কিনেছি।

অন্যদিকে, নওগাঁর বদলগাছী এলাকার কৃষক মজিদুল ইসলাম বলেন, ডিলার কয়েকদিন ঘুরিয়ে সার দেয়নি। এরপর এক স্থানীয় প্রতিনিধি দিয়ে ফোন দিয়ে সার নিয়েছি।

দিনাজপুর সদর উপজেলার কমলপুর গ্রামের কৃষক আকবর আলী বলেন, বাজারে সার নেই। বাধ্য হয়ে খুচরা বিক্রেতার কাছ থেকে প্রতি কেজি ইউরিয়া ৪০ টাকা কেজি দরে কিনেছি, কারণ এখন সার দিতেই হবে। আমরা সার ডিলারদের কাছে বার বার গিয়ে ঘুরে আসছি।

আরও পড়ুন

কুড়িগ্রামে লুটের পর ৫৮ বস্তা সার উদ্ধার

দেশে সারের সংকট নেই দাবি করে মাঠপর্যায়ের অস্থিরতাকে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছে কৃষি মন্ত্রণালয়। সম্প্রতি মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, ‘সার নিয়ে মাঠে বিশৃঙ্খলা হচ্ছে, এটা একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র।’

তিনি বলেন, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এবার দেশে বেশি সার মজুত রয়েছে। অনেক সরকারি গুদামে সার রাখার জায়গাও নেই। সার নিয়ে নতুন একটি নীতিমালা করেছি। সেজন্য যারা বঞ্চিত হবেন বলে মনে করছেন, তারা সমস্যা করছেন। যেহেতু আমাদের কাছে সার আছে, তাই ষড়যন্ত্র নিয়ে ভয় নেই। আমি বলবো যারা এসব করছেন ‘এগুলো ভালো না, এগুলো করবেন না।’

কৃষি মন্ত্রণালয়ের দাবি, আওয়ামী ঘরানার অনেক ডিলার বরাদ্দ করা সার উত্তোলন না করেই মাঠে সংকটের কথা বলছেন। কেউ কেউ আবার বরাদ্দের সার খুচরা বিক্রেতা বা অন্য প্রতিনিধির কাছে বিক্রি করে দিচ্ছেন। এছাড়া কিছু অসাধু ডিলার সিন্ডিকেট করে বেশি দামে সার বিক্রি করছেন।

আরও পড়ুন

তীব্র সংকট / ডিলারের গুদামের দরজা ভেঙে ১৯৭ বস্তা সার নিয়ে গেলেন কৃষকরা

মন্ত্রণালয় বলছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ডিলারশিপ পাওয়া অনেকেই নতুন নীতিমালায় ডিলারশিপ হারানোর আশঙ্কা থেকে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছেন। এর সঙ্গে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) ও বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) ডিলারদের মধ্যে দীর্ঘদিনের রেষারেষিও রয়েছে।

সম্প্রতি নতুন নীতিমালায় বিসিআইসি ও বিএডিসির ডিলারদের সমন্বিত ব্যবস্থায় আনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ লক্ষ্যে ‘সার ডিলার নিয়োগ ও সার ডিলার সংরক্ষণ সংক্রান্ত নীতিমালা-২০২৫ (সংশোধিত)’ জারি করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়।

আর এর ফলে, নতুন ব্যবস্থার বিরোধিতা করে আসা পুরোনো ডিলার ও সার ব্যবসায়ীদের একটি অংশ এখনো সক্রিয় বলে অভিযোগ করেছেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।

আরও পড়ুন

মাটির উর্বরতা ফিরিয়ে আনতে হবে: কৃষিমন্ত্রী

এছাড়া এবার চা বাগানের জন্য বরাদ্দ না থাকলেও নিয়মিত সরবরাহ ব্যবস্থা থেকে সেখানে সার দেওয়া হচ্ছে। আবার অনেক কৃষক আছেন, যারা সংকটের শঙ্কায় আগাম আলু চাষের জন্য সার কিনে মজুত করছেন।

কৃষি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নতুন নীতিমালার কারণে খুচরা বিক্রেতাদের বাতিল করা হবে বলে যে আলোচনা রয়েছে সেটাও প্রভাব ফেলছে এ সার পরিস্থিতিতে। কিন্তু যাদের লাইসেন্স ঠিক নেই, একজনের লাইসেন্স দিয়ে অন্যজন ব্যবসা করছেন এমন সমস্যাযুক্ত খুচরা বিক্রেতা ছাড়া বাকিদের কোনো সমস্যা হবে না। কিন্তু সারাদেশে এদের নিয়ে গুজব ছড়ানো হচ্ছে। এসব কারণেই সারের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

ডিলারদের দাবি, নীতিমালার পরে কিছু সমস্যা থাকলেও বাস্তবে সারের সরবরাহ ও বরাদ্দ কম। কুড়িগ্রাম ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও সার ডিলার শামসুল ইসলাম মন্ডল বলেন, চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া ময়মনসিংহ জেলা ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এম এম বাবুল বলেন, সারের সরবরাহ ও বরাদ্দ কম। সবমিলে উৎপাদন মৌসুমে এ নীতিমালা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত ও অপ্রতুল বরাদ্দ সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আরও পড়ুন

কৃষিমন্ত্রী / পেঁয়াজ, কাঁচামরিচ, টমেটো আমদানিনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসবে দেশ

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য থেকে জানা যায়, গত ১৯ আগস্ট পর্যন্ত দেশে প্রধান চার ধরনের সারের মজুত ছিল সন্তোষজনক। ইউরিয়ার প্রারম্ভিক মজুত ছিল ৬ লাখ ১৪ হাজার টন। এছাড়া ৪ লাখ ৯ হাজার টন টিএসপি, ৪ লাখ ৫৮ হাজার টন ডিএপি ও এমওপির প্রারম্ভিক মজুত ২ লাখ ৮৪ হাজার টন। চলতি আমন মৌসুমের জন্য পর্যাপ্ত সারের বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। আগামী সেপ্টেম্বর মাসে ইউরিয়ার বরাদ্দ ২ লাখ ২৬ হাজার টনসহ মোট বরাদ্দ প্রায় ৪ লাখ ৪৩ হাজার টন।

উৎপাদনকারী কারখানার উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে সরকার। এতে নিরাপত্তা মজুত ও আসন্ন বোরো মৌসুমে সারের সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এই অনিশ্চয়তা কাটানোর মতো পর্যাপ্ত সার মজুতও বর্তমানে সরকারের হাতে নেই। ফলে ঘাটতি পূরণে বিদেশ থেকে সার আমদানি করা হচ্ছে।

এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে সরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন দেশ ও প্রতিষ্ঠান থেকে আরও ৩ লাখ ৬৫ হাজার মেট্রিক টন সার কেনা হচ্ছে। এতে ব্যয় হবে ২ হাজার ৬৯৫ কোটি টাকা।

কেনা সারের মধ্যে রয়েছে ৭০ হাজার টন ইউরিয়া, ১ লাখ ১৫ হাজার টন এমওপি, ১ লাখ ২০ হাজার টন ডিএপি এবং ৬০ হাজার টন টিএসপি।

সোমবার (২৪ আগস্ট) সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এসব সার কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

এসব বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সেলিম খান জাগো নিউজকে বলেন, সার নিয়ে সমস্যা করছে পুরোনো ডিলাররা। যে পরিমাণ সার আমাদের রয়েছে ও বরাদ্দ দিয়েছি তাতে সমস্যা হবে না। সবাই সার পাবে। তবে নতুন নীতিমালা নিয়ে কিছু বিভ্রান্তিকর তথ্য ছাড়ানো হচ্ছে। যা মাঠে বিশৃঙ্খলা তৈরি করছে।

পুরোনো ডিলাররাই সার নিয়ে সমস্যা তৈরি করছেন। পর্যাপ্ত মজুত ও বরাদ্দ থাকায় সবার সার পাবে, কোনো সমস্যা হবে না। তবে নতুন নীতিমালা নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে, যা মাঠে বিশৃঙ্খলা তৈরি করছে।— কৃষি সচিব মো. সেলিম খান

তিনি বলেন, ডিলারদের মধ্যে কিছু সমস্যা রয়েছে, এগুলো আমরা কঠোর মনিটরিং শুরু করেছি। এছাড়া ৬৪ জেলার কৃষি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সভা করেছি। তাদের মনিটরিংয়ে কঠোর হওয়ার পাশাপাশি সতর্ক করা হয়েছে।

এনএইচ/এমএএইচ/

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন jagofeature@gmail.com ঠিকানায়।