গ্যাস সংকটের ধাক্কায় অস্থির চিনির বাজার

ইকবাল হোসেন
ইকবাল হোসেন ইকবাল হোসেন , নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম
প্রকাশিত: ০৩:২৮ পিএম, ১৫ আগস্ট ২০২৬
গ্যাস সংকটের ধাক্কা লেগেছে শিল্প কারখানার উৎপাদনে/ ছবি- এআই নির্মিত

দেশে চলমান গ্যাস সংকটে বিপর্যস্ত জনজীবন। জ্বলছে না চুলা, গ্যাস পেতে সিএনজিচালিত যানবাহনকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে ফিলিং স্টেশনে। তবে, গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে শিল্প কারখানার উৎপাদনে।

গ্যাসের চাপ না থাকায় বন্ধ রাখা হয়েছে দেশের অসংখ্য শিল্প কারখানা। এরমধ্যে গত তিন দিন বন্ধ রয়েছে দেশের শীর্ষ চিনি উৎপাদনকারী কারখানাগুলো। আগামী কয়েকদিনে কোম্পানিগুলোর কাছে থাকা চিনির মজুত শেষ হলে দেশজুড়ে সরবরাহ চেইনে বড় ধাক্কার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

আরও পড়ুন

গ্যাস সংকট / স্থবির হবিগঞ্জ শিল্পাঞ্চল, ছাঁটাই আতঙ্কে দেড়লাখ শ্রমিক

এরই মধ্যে বাজারে কমেছে চিনির সরবরাহ। পাশাপাশি বাড়তে শুরু করেছে দাম। দেশের বৃহৎ পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে গত তিন দিনে প্রতি মণ চিনির দাম বেড়েছে ৭০-৭৫ টাকা। শনি-রোববার থেকে এ দাম আরও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। পাশাপাশি সরবরাহ কমে গেলে চিনির অন্যতম ব্যবহারকারী হিসেবে খাদ্যপণ্য প্রস্তুতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

দেশের চাহিদা মেটাতে প্রতি বছর প্রায় ২২ লাখ টন চিনি প্রয়োজন। চাহিদার ৯৮ শতাংশের বেশি চিনি আমদানি করতে হয়। দেশে ব্যক্তিখাতের পাঁচ শিল্পগ্রুপ- সিটি, মেঘনা, এস আলম, আবদুল মোনেম লিমিটেড ও দেশবন্ধু সুগার মিল অপরিশোধিত চিনি আমদানি করে। পরে নিজেদের কারখানায় পরিশোধন করে এসব চিনি বাজারজাত করে তারা। এরমধ্যে ২০২৪ সালের মাঝামাঝিতে আবদুল মোনেম লিমিটেডের ঈগলু ব্রান্ডের কারখানা কিনে নিয়েছে দেশের আরেক জায়ান্ট শিল্প গ্রুপ আবুল খায়ের। স্মাইল ফুড লিমিটেড নামে কারখানাটি চালাচ্ছেন তারা।

সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাজারে দামও বাড়ছে। তিন দিনের ব্যবধানে মণপ্রতি ৭০-৭৫ টাকা বেড়েছে। শুক্রবার প্রতিমণ রেডি চিনি বিক্রি হয়েছে ৩ হাজার ৭২৫ টাকা। অথচ মঙ্গলবার দাম ছিল ৩৬৫০-৩৬৫৫ টাকা।— খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ী সিরাজুল ইসলাম

বিতর্কিত শিল্প গ্রুপ এস আলমের চিনি কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে গত মাসে। ব্যাংকঋণ জটিলতায় ৬ মাসের বেশি সময় বন্ধ রয়েছে দেশবন্ধু সুগার মিল। উৎপাদনে থাকা দেশের শীর্ষ চিনি উৎপাদনকারী সিটি গ্রুপের তীর, মেঘনা গ্রুপের ফ্রেশ এবং আবুল খায়ের গ্রুপের স্মাইল ফুডের স্টার শিপ কারখানায় বন্ধ রয়েছে উৎপাদন।

আরও পড়ুন

গ্যাসের সংকটে স্থবির চট্টগ্রাম, বাড়ছে জনভোগান্তি

গ্যাস সংকটে চিনি কারখানার উৎপাদন আরও বিলম্বিত হলে দেশের চিনির সরবরাহ চেইনে নেতিবাচক প্রভাবের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে পাইকারি বাজারে বাড়তে শুরু করেছে চিনির দাম।

খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ী সিরাজুল ইসলাম পাইকারি বাজার থেকে চিনি কিনে সরবরাহ করেন খাদ্যপণ্য উৎপাদনকারী কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে। গতকাল শুক্রবার বিকেলে কথা হলে জাগো নিউজকে তিনি বলেন, গ্যাসের সংকটে দেশের চিনির কারখানাগুলো বন্ধ। বর্তমানে চট্টগ্রামে মেঘনা, সিটি ও স্টার শিপের চিনি আসে। বৃহস্পতিবার স্টার শিপ এবং মেঘনা কারখানায় গাড়ি পাঠিয়েছি। এরমধ্যে স্টার শিপ লোড দিচ্ছে না, মেঘনা তাদের গুদাম থেকে চিনি লোড দিচ্ছে। কিন্তু তাদের ব্যাল্ট বন্ধ, মানে কারখানায় উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ।

আরও পড়ুন

হবিগঞ্জে ১৭১ শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ

সিরাজুল ইসলাম আরও বলেন, চট্টগ্রামে চিনির পুরো বাজার ছিল এস আলমের। এস আলম কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সিটি, মেঘনা ও স্টার শিপ থেকে আমরা চিনি সংগ্রহ করি। বর্তমানে সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাজারে দামও বাড়ছে। তিন দিনের ব্যবধানে মণপ্রতি ৭০-৭৫ টাকা বেড়েছে। শুক্রবার প্রতিমণ রেডি চিনি বিক্রি হয়েছে ৩ হাজার ৭২৫ টাকা। অথচ মঙ্গলবার দাম ছিল ৩৬৫০-৩৬৫৫ টাকা।

সিটি গ্রুপের তীর কারখানা বন্ধ। স্টার শিপ কারখানায় এখন ১০ দিনের সিরিয়াল রয়েছে। অর্থাৎ, আজ ডিও কিনলে সরবরাহ পাওয়া যাবে ১০ দিন পর। শুধু মেঘনা গ্রুপ তাদের কারখানা থেকে চিনি সরবরাহ দিচ্ছে। শুনেছি তাদের কারখানাও বন্ধ। যেভাবে চলছে, তাতে সামনের সপ্তাহে কারখানাগুলো কোথা থেকে চিনি সরবরাহ দেবে?— চিনির আড়ৎদার ছৈয়দুল হক

একই কথা বলেন খাতুনগঞ্জের চিনি ও ভোজ্যতেলের আড়ৎদার ইমাম শরীফ ব্রাদার্সের পরিচালক ছৈয়দুল হক। জাগো নিউজকে তিনি বলেন, আমরা বৃহস্পতিবার প্রতি মণ চিনি ৩ হাজার ৭২০ টাকায় বিক্রি করেছি। গ্যাস সংকটে কারখানাগুলোতে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। এস আলম কারখানা আগে থেকেই বন্ধ। গ্যাসের কারণে সিটি গ্রুপের তীর কারখানা বন্ধ। স্টার শিপ কারখানায় এখন ১০ দিনের সিরিয়াল রয়েছে। অর্থাৎ, আজ ডিও কিনলে সরবরাহ পাওয়া যাবে ১০ দিন পর। শুধু মেঘনা গ্রুপ তাদের কারখানা থেকে চিনি সরবরাহ দিচ্ছে। শুনেছি তাদের কারখানাও বন্ধ। যেভাবে চলছে, তাতে সামনের সপ্তাহে কারখানাগুলো কোথা থেকে চিনি সরবরাহ দেবে?

আরও পড়ুন

গ্যাস সংকট / জ্বলছে না চুলা-সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ লাইন, চরম ভোগান্তিতে জনজীবন

খাতুনগঞ্জে বড় পাইকারি ব্যবসায়ী আর এম এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী আলমগীর পারভেজ জাগো নিউজকে বলেন, খাতুনগঞ্জে চিনির সরবরাহ কমেছে। বিশেষ করে গ্যাস সংকটের কারণে বড় কারখানাগুলো বন্ধ। এতে চাহিদার সঙ্গে জোগানের ফারাক তৈরি হচ্ছে। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে, যদি কারখানাগুলো বেশিদিন বন্ধ থাকে- তাহলে সাপ্লাই চেইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

দেশের শীর্ষ চিনি উৎপাদনকারী মেঘনা গ্রুপের প্রধান বিক্রয় কর্মকর্তা নাসির উদ্দিন আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, গত তিনদিন ধরে আমাদের সবগুলো কারখানার উৎপাদন বন্ধ। গোডাউনে অল্প কিছু চিনি মজুত রয়েছে। তাতে এখনো সরবরাহ দিচ্ছি।

আরও পড়ুন

ছয় মাসে সরকারের উদ্যোগ আছে, তবে অর্থনীতির পুঞ্জীভূত সংকট কাটেনি

গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে সারাদেশে চিনির সংকট তৈরি হবে মন্তব্য করে তিনি বলেন, আগে যেখনে প্রতিদিন ৫ হাজার টন ডেলিভারি দিতাম, এখন ডেলিভারি দিচ্ছি দুই হাজার টন। বাকি তিন হাজার টন কোথা থেকে আসবে? আমাদের স্টকে তিন থেকে চার দিনের চিনি রয়েছে। এরপর থেকে সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাবে। 

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে গ্যাসের চাহিদা চার হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের কাছাকাছি। স্বাভাবিক সময়ে দেশি উৎস ও আমদানির মাধ্যমে পেট্রোবাংলা সরবরাহ দেয় তিন হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের মতো। বর্তমানে ২১-২২শ ঘনফুট সরবরাহ দেওয়ায় সারাদেশের মতো চট্টগ্রামেও চলছে গ্যাসের জন্য হাহাকার।

আগে যেখনে প্রতিদিন ৫ হাজার টন ডেলিভারি দিতাম, এখন ডেলিভারি দিচ্ছি দুই হাজার টন। বাকি তিন হাজার টন কোথা থেকে আসবে? আমাদের স্টকে তিন থেকে চার দিনের চিনি রয়েছে। এরপর থেকে সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাবে।— মেঘনা গ্রুপের প্রধান বিক্রয় কর্মকর্তা নাসির উদ্দিন আহমেদ

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সরকারি প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলা নিয়ন্ত্রণাধীন দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ২ হাজার ৭৫০ মিলিয়ন ঘনফুট প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলন করার সক্ষমতা রয়েছে। পাশাপাশি এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) আমদানি করে এক হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করতে পারে।

এর মধ্যে কক্সবাজারের মহেশখালীতে স্থাপিত সামিট ও এক্সিলারেট এনার্জির দুই ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ- ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট) থেকে নিয়মিত ৯৫০ থেকে এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্যাস গ্রিডে সরবরাহ করে রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল)। কিন্তু গত ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল আগুন লেগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর ওই টার্মিনাল থেকে এলএনজি সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে সারাদেশে পাইপলাইনে গ্যাসের সরবরাহে বিঘ্ন তৈরি হয়।

আরও পড়ুন

লোডশেডিংয়ে ধস নেমেছে সরু চাল উৎপাদনে

পরে ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালটি মেরামত করে গত ৫ আগস্ট আংশিক গ্যাস সরবরাহ শুরু হলেও বৈরী আবহাওয়ার কারণ দেখিয়ে সামিটের এফএসআরইউ গত তিনদিন এলএনজি খালাস বন্ধ রাখে। এতে টার্মিনাল দুটি থেকে সরবরাহ একেবারে কমে গিয়ে সারাদেশে তীব্র গ্যাস সংকট তৈরি হয়। বন্ধ হয়ে যায় শত শত শিল্প কারখানা।

সবশেষ খবর অনুযায়ী শুক্রবার বিকেল থেকে সামিটের এফএসআরইউ জাহাজ থেকে এলএনজি খালাস শুরু হয়। এরপর পাইপলাইনে গ্যাসের সরবরাহ বাড়িয়েছে আরপিজিসিএল। কথা হলে শুক্রবার সন্ধ্যায় আরপিজিসিএল চট্টগ্রামের উপ-মহাব্যবস্থাপক (এলএনজি) প্রকৌশলী মো. নাছির উদ্দীন জাগো নিউজকে বলেন, আবহাওয়া স্বাভাবিক হওয়ায় সামিটের টার্মিনালে এলএনজি খালাস শুরু হয়েছে। এতে লাইনে গ্যাস সরবরাহ বাড়তে শুরু করবে। আশা করছি শনিবার থেকে গ্যাসের চাপ আরও বাড়বে।

এমডিআইএইচ/কেএসআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন jagofeature@gmail.com ঠিকানায়।