ছয় মাসে সরকার ভিন্ন কিছু দেখাতে পারেনি
সরকারের ছয় মাসের কার্যক্রম মূল্যায়ন করতে গিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ তেল, গ্যাস, খনিজসম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সাবেক সদস্যসচিব আনু মুহাম্মদ বলেছেন, গত ছয় মাসে আগের সরকারগুলোর তুলনায় মৌলিক কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি।
তারমতে, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত, রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প, ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং বিনিয়োগ পরিবেশে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপে জনস্বার্থের চেয়ে গোষ্ঠীস্বার্থই বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। একই সঙ্গে জনগণের প্রত্যাশাকেও সরকার যথাযথ গুরুত্ব দিচ্ছে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
চাঁদাবাজি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বন্ধ, প্রকৃত উদ্যোক্তাদের হয়রানি দূর করা এবং জনস্বার্থভিত্তিক নীতি গ্রহণের ওপর জোর দেন আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেন, জনগণের সমর্থন নিয়ে নির্বাচিত হওয়াই বর্তমান সরকারের সবচেয়ে বড় সুযোগ। এখন সেই সুযোগ সরকার কতটা কাজে লাগাতে পারে, সেটিই মূল প্রশ্ন।
বর্তমান সরকারের প্রথম ছয় মাসের কার্যক্রম নিয়ে জাগো নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেন আনু মুহাম্মদ। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন জাগো নিউজের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক সাঈদ শিপন।
জাগো নিউজ: সরকারের ছয় মাস প্রায় পূর্ণ হতে যাচ্ছে। এ ছয় মাসের কার্যক্রমকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন? সফলতা বা ব্যর্থতা।
আনু মুহাম্মদ: সফলতা বা ব্যর্থতা নির্ভর করে কে কোন বিষয়কে কীভাবে দেখছে এবং সরকারের উদ্দেশ্য কী ছিল, তার ওপর। সরকার যেসব বিষয়কে সফলতা হিসেবে তুলে ধরছে, সাধারণ মানুষের কাছে সেগুলো সফলতা নাও হতে পারে। যেমন, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতকে কিছু গোষ্ঠী বা কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়াকে সরকার সাফল্য হিসেবে দেখাতে পারে। কিন্তু জনগণের দৃষ্টিতে এটি বড় ধরনের জনস্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্ত।
গত ছয় মাসে সরকার আগের সরকারগুলোর তুলনায় ভিন্ন কিছু দেখাতে পারেনি। চাঁদাবাজি, দখলদারত্ব, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর হাতে ছেড়ে দেওয়া এবং জনস্বার্থবান্ধব জ্বালানি ও বিদ্যুৎ নীতি গ্রহণ না করার মতো বিষয়গুলো আগের সরকারগুলোর সময়ও ছিল। শেখ হাসিনার সরকার, অন্তর্বর্তী সরকার এবং বর্তমান সরকারের সময়েও এই ধারাবাহিকতায় কোনো মৌলিক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না।
আমি প্রত্যাশা করেছিলাম, বর্তমান সরকার এ জায়গাগুলোতে পরিবর্তন আনবে। কিন্তু বাস্তবে সরকার সেই পথে এগোচ্ছে না।
জাগো নিউজ: এ সরকারের প্রতি মানুষের প্রত্যাশা অনেক ছিল। সেই প্রত্যাশা কতটা পূরণ হয়েছে?
আনু মুহাম্মদ: আমি বলবো, সরকার জনগণের সেই প্রত্যাশাকে কোনো গুরুত্বই দিচ্ছে না। সরকার নিজস্ব এজেন্ডা অনুযায়ী কাজ করছে, যে এজেন্ডার অনেকটাই শেখ হাসিনার সরকারের সময় ছিল এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও অব্যাহত ছিল।
যেমন, মার্কিন বাণিজ্যচুক্তির উদ্যোগ শেখ হাসিনার সরকারের সময় নেওয়া হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারও সেই পথেই এগিয়েছে, বর্তমান সরকারও একই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে। একইভাবে, বন্দর চুক্তির উদ্যোগও শেখ হাসিনার সরকারের সময় নেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীসময়ে অন্তর্বর্তী সরকার এবং বর্তমান সরকারও একই পথে এগোচ্ছে।
অর্থাৎ, এসব ক্ষেত্রে এক ধরনের ধারাবাহিকতা চলছে। এখানে কোনো মৌলিক পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি না।
জাগো নিউজ: আর্থিক ও ব্যাংকিং খাতের পরিস্থিতিকে কীভাবে দেখছেন? অর্থনীতির ক্ষেত্রে গত ছয় মাসে কোনো উন্নতি হয়েছে কী?
আনু মুহাম্মদ: আর্থিক খাতে কয়েকটি ব্যাংক একীভূত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এ উদ্যোগ অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও নেওয়া হয়েছিল। এখন পর্যন্ত এর কোনো কার্যকর ফলাফল আমরা দেখিনি।
এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এই নিয়োগের মধ্য দিয়ে এমন একটি বার্তা গেছে যে, সরকার ব্যাংকিং খাতের বিশেষজ্ঞ বা যোগ্য ব্যক্তির পরিবর্তে দলীয় লোক নিয়োগকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এটি দলীয়করণের একটি দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর প্রভাব সামনে আরও স্পষ্ট হবে। মাত্র কয়েক মাস হয়েছে, তাই সময়ের সঙ্গে এর ফলাফল আরও পরিষ্কারভাবে বোঝা যাবে।
জাগো নিউজ: সামনে সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জগুলো কী?
আনু মুহাম্মদ: চ্যালেঞ্জ কী, সেটা সরকারের ওপর নির্ভর করে। সরকার কোন বিষয়কে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। তবে জনগণের দিক থেকে বড় চ্যালেঞ্জ হলো- জনস্বার্থবিরোধী তৎপরতায় সরকার খুব দ্রুতগতিতে অগ্রসর হচ্ছে। সেটিই জনগণের সমস্যা। সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে যা মনে হচ্ছে, সরকার যত দ্রুত বিভিন্ন কোম্পানিকে খুশি করতে পারে কিংবা দলীয় লোকজনের মধ্যে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ভাগবাটোয়ারা করতে পারে, তাদের আগ্রহ যেন সেদিকেই বেশি।
জাগো নিউজ: দীর্ঘদিন ধরে দেশে বিনিয়োগ স্থবির। গত ছয় মাসে বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও তো তেমন গতি আসেনি। এর কারণ কী?
আনু মুহাম্মদ: বিনিয়োগে গতি আসার জন্য অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করতে হবে। শুধু কয়েকটি গোষ্ঠীর স্বার্থ দেখলে হবে না। সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরি করতে হলে চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে, আমলাতান্ত্রিক বাধা-বিপত্তি দূর করতে হবে এবং প্রকৃত উদ্যোক্তাদের হয়রানি বন্ধ করার ব্যবস্থা করতে হবে। দলীয় পরিচয় কিংবা আত্মীয়স্বজনের পরিচয় বাদ দিয়ে প্রকৃত উদ্যোক্তাদের পৃষ্ঠপোষকতা দিতে হবে। এসব বিষয়ে এখন পর্যন্ত আমরা খুব পরিষ্কার কোনো উদ্যোগ দেখতে পাইনি।
জাগো নিউজ: সামনে সরকারের জন্য সুযোগ বা সুবিধাজনক অবস্থান কী আছে?
আনু মুহাম্মদ: সুবিধাজনক অবস্থান তো ছিলই। একটি নির্বাচিত সরকার জনগণের সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে এটাই তাদের জন্য বড় সুযোগ ছিল। এখন সেই সুযোগ সরকার কতটা কাজে লাগাতে পারবে, সেটাই হচ্ছে প্রশ্ন।
এমএএস/এমএএইচ/এমএফএ



