চাঁদপুরে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে টয়েলট সংকট, বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

শরীফুল ইসলাম শরীফুল ইসলাম , চাঁদপুর প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ০৪:১১ পিএম, ২৯ আগস্ট ২০২৬
অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় রয়েছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের টয়লেট/ ছবি: জাগো নিউজ

চাঁদপুরের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি (ওয়াশ) ব্যবস্থার চিত্র উদ্বেগজনক। কোথাও শিক্ষার্থীর তুলনায় টয়লেটের সংখ্যা অপ্রতুল, কোথাও আবার প্রয়োজনীয় অবকাঠামো থাকলেও পরিচ্ছন্নতা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে তা ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। অনেক বিদ্যালয়ে নেই আলাদা পরিচ্ছন্নতাকর্মী, নেই টয়লেট ব্যবহারের বিষয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ বা সচেতনতামূলক কার্যক্রম। ফলে একদিকে যেমন শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে, অন্যদিকে শিক্ষা পরিবেশেও তৈরি হচ্ছে নানা সংকট।

চাঁদপুর জেলায় মোট ১ হাজার ১৫৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে চাঁদপুর সদরে ১৭২টি, কচুয়ায় ১৭১টি, হাজীগঞ্জে ১৫৭টি, শাহরাস্তিতে ১০১টি, হাইমচরে ৭১টি, ফরিদগঞ্জে ১৯০টি, মতলব দক্ষিণে ১১৩টি এবং মতলব উত্তরে ১৮০টি বিদ্যালয় রয়েছে।

চাঁদপুর শহরসহ জেলার বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয় ঘুরে দেখা গেছে, বিদ্যালয়ভেদে ওয়াশ ব্যবস্থার সংকটের ধরন ভিন্ন হলেও সমস্যা রয়েছে প্রায় সর্বত্রই। কোথাও জরাজীর্ণ ভবনের কারণে পর্যাপ্ত টয়লেট নির্মাণের সুযোগ নেই, কোথাও আবার টয়লেট থাকলেও নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাবে দুর্গন্ধ ও অপরিচ্ছন্নতায় ভোগান্তিতে পড়ছে শিক্ষার্থীরা। বিশেষ করে শহরের বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় সীমিতসংখ্যক টয়লেট ব্যবহার করতে গিয়ে দীর্ঘ অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে শিশুদের।

‘বিদ্যালয়গুলোতে আলাদা কোনো পরিচ্ছন্নতাকর্মী নেই। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরাই টয়লেট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার চেষ্টা করে। শিক্ষার্থীদের সচেতন করতে আলাদা প্রশিক্ষণ বা বরাদ্দও নেই। বিদ্যালয়ে মূলত শ্রেণিকক্ষের কার্যক্রমই মনিটরিং করা হয়। শিক্ষার্থীরা যখন ওয়াশরুমে যায়, তখন আলাদাভাবে মনিটরিং করার সুযোগ থাকে না। এ ক্ষেত্রে অভিভাবকরাই তাদের সন্তানদের টয়লেট ব্যবহারে সচেতন করতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।’

অভিভাবকদের মতে, শিশুদের শিক্ষার পাশাপাশি নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ও হাত ধোয়ার অভ্যাস নিশ্চিত করা জরুরি। শুধু টয়লেট নির্মাণ করলেই ওয়াশ ব্যবস্থার উন্নয়ন সম্ভব নয়; নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, পর্যাপ্ত পানি ও সাবানের ব্যবস্থা, মানববর্জ্যের নিরাপদ ব্যবস্থাপনা এবং শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের একটি বড় অংশ প্রতিদিন দীর্ঘ সময় বিদ্যালয়ে অবস্থান করে। তাই বিদ্যালয়ে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত ওয়াশ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা না গেলে তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি উপস্থিতি ও পড়াশোনাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এ অবস্থায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা বিবেচনায় টয়লেটের সংখ্যা বাড়ানো, জরাজীর্ণ ভবন ও স্যানিটেশন অবকাঠামো সংস্কার, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থা এবং শিশুদের স্বাস্থ্যবিধি বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।

‘আমাদের বিদ্যালয়ে টয়লেট কম। একজন টয়লেটে গেলে অন্যদের দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয়। বেশি ব্যবহারের কারণে অনেক সময় টয়লেটে দুর্গন্ধও হয়। আমাদের জন্য নতুন ভবন ও পর্যাপ্ত টয়লেট হলে এই সমস্যা থাকবে না।’

চাঁদপুর সদর উপজেলার তরপুরচন্ডী ইউনিয়নের পূর্ব তরপুরচন্ডী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চিত্র তারই একটি উদাহরণ। বিদ্যালয়টিতে ১৫৭ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। এর মধ্যে ৬৭ জন বালক ও ৯০ জন বালিকা। শিক্ষক রয়েছেন ছয়জন। বিদ্যালয়ে টয়লেটের সংখ্যা থাকলেও নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা ও ব্যবহারের সঠিক নিয়ম না জানার কারণে সেগুলো অপরিচ্ছন্ন হয়ে পড়ছে। দুর্গন্ধের কারণে অনেক সময় টয়লেট ব্যবহার করাও শিক্ষার্থীদের জন্য কষ্টকর হয়ে ওঠে।

আরও পড়ুন

নতুন ভবনে নেই টয়লেট-পানি, অন্য স্কুলে ক্লাস শিক্ষার্থীদের

বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জানায়, টয়লেটে প্রায়ই দুর্গন্ধ থাকে। অনেক সময় সাবান ও পানি পাওয়া যায় না। ফলে টয়লেট ব্যবহারের পর হাত পরিষ্কার করার সুযোগও থাকে না।

পূর্ব তরপুরচন্ডী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আমেনা বেগম বলেন, আমাদের বিদ্যালয়ে টয়লেট আছে, তবে আলাদা কোনো পরিচ্ছন্নতাকর্মী নেই। বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সহযোগিতায় টয়লেট পরিষ্কার করা হয়। শিক্ষার্থীদের আলাদাভাবে টয়লেট ব্যবহারের নিয়ম বা পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে প্রশিক্ষণেরও কোনো ব্যবস্থা নেই।

‘আমাদের বিদ্যালয়ে টয়লেট আছে, তবে আলাদা কোনো পরিচ্ছন্নতাকর্মী নেই। বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সহযোগিতায় টয়লেট পরিষ্কার করা হয়। শিক্ষার্থীদের আলাদাভাবে টয়লেট ব্যবহারের নিয়ম বা পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে প্রশিক্ষণেরও কোনো ব্যবস্থা নেই।’

শহরের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত বিষ্ণুদী আজিমিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চিত্র আবার ভিন্ন। বিদ্যালয়ের টয়লেটগুলো তুলনামূলক পরিচ্ছন্ন থাকলেও শিক্ষার্থীর তুলনায় তা একেবারেই অপ্রতুল। জরাজীর্ণ ও ছোট ভবনের এই বিদ্যালয়ে বর্তমানে শিক্ষার্থী রয়েছে ৮৬৩ জন। অথচ মেয়েদের জন্য রয়েছে মাত্র একটি এবং ছেলেদের জন্য দুটি টয়লেট। বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর জন্য এত কমসংখ্যক টয়লেট থাকায় প্রতিদিনই ব্যবহার নিয়ে দুর্ভোগে পড়তে হয় তাদের।

আরও পড়ুন

জয়পুরহাটে প্রধান শিক্ষক ছাড়াই চলছে ৮৩ প্রাথমিক বিদ্যালয়

বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জারিন আহমেদ ও আব্দুল্লাহ ফাহিদ জানায়, আমাদের বিদ্যালয়ে টয়লেট কম। একজন টয়লেটে গেলে অন্যদের দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয়। বেশি ব্যবহারের কারণে অনেক সময় টয়লেটে দুর্গন্ধও হয়। আমাদের জন্য নতুন ভবন ও পর্যাপ্ত টয়লেট হলে এই সমস্যা থাকবে না।

বিষ্ণুদী আজিমিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হোসনে আরা জাগো নিউজকে বলেন, আমাদের প্রথমেই নতুন ভবন প্রয়োজন। ভবনই পর্যাপ্ত নেই, সেখানে টয়লেটের ব্যবস্থা কীভাবে বাড়ানো হয় হবে জানা নেই। জরাজীর্ণ টয়লেট সংস্কার করে বর্তমানে ব্যবহার করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের ক্লাসরুমেই টয়লেট ব্যবহারের বিষয়ে সচেতন করা হয়। পাশাপাশি মা সমাবেশের মাধ্যমে অভিভাবকদেরও সচেতন করা হয়। তবে টয়লেট ব্যবহারের বিষয়ে আলাদা কোনো প্রশিক্ষণ বা বরাদ্দ নেই।

অভিভাবক আফরোজা, ইয়াকুব ও মমিনসহ কয়েকজন জানান, অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই শিক্ষার্থীর তুলনায় পর্যাপ্ত টয়লেট নেই। আবার যেগুলো রয়েছে, সেগুলোও সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকে না। স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট ব্যবহারের সুযোগ না পেলে শিক্ষার্থীরা নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে পারে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত তদারকি করা প্রয়োজন। পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা টয়লেট ব্যবহারের সময় পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যবিধি মানছে কিনা, সেদিকেও নজর দেওয়া দরকার।

চাঁদপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মোহাম্মদ মোছাদ্দেক হোসেন বলেন, শিক্ষার্থীদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার শিক্ষা মূলত পরিবার থেকেই শুরু হয়। শহরের বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় টয়লেটের ওপর চাপও বেশি। গ্রামাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতে তুলনামূলকভাবে টয়লেট ব্যবস্থাপনা ভালো থাকার কথা থাকলেও শিক্ষার্থীদের অসচেতনতার কারণে অনেক সময় সেগুলো অপরিচ্ছন্ন হয়ে পড়ে।

আরও পড়ুন

পাসপোর্ট অফিসের গেটে পা রাখলেই ঘিরে ধরে দালালরা

তিনি আরও বলেন, শিক্ষার্থীর তুলনায় টয়লেটের সংখ্যা কম, এটি সত্য। এর পাশাপাশি কিছু বিদ্যালয়ে অবকাঠামোগত সমস্যাও রয়েছে। জেলায় এরই মধ্যে দুই শতাধিক বিদ্যালয়ের জন্য নতুন ভবনের আবেদন করা হয়েছে। নতুন ভবন হলে টয়লেট সংকটসহ কিছু সমস্যার সমাধান হবে।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার বলেন, বিদ্যালয়গুলোতে আলাদা কোনো পরিচ্ছন্নতাকর্মী নেই। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরাই টয়লেট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার চেষ্টা করে। শিক্ষার্থীদের সচেতন করতে আলাদা প্রশিক্ষণ বা বরাদ্দও নেই। বিদ্যালয়ে মূলত শ্রেণিকক্ষের কার্যক্রমই মনিটরিং করা হয়। শিক্ষার্থীরা যখন ওয়াশরুমে যায়, তখন আলাদাভাবে মনিটরিং করার সুযোগ থাকে না। এ ক্ষেত্রে অভিভাবকরাই তাদের সন্তানদের টয়লেট ব্যবহারে সচেতন করতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।

এনএইচআর/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন jagofeature@gmail.com ঠিকানায়।