বর্ষায় দুধ উৎপাদন অর্ধেক, খাবারের খরচ মেটাতে হিমশিম খামারিরা
‘বর্ষার কথা সামনে আসতেই চার গাভি পালনে লাখ টাকার ঝুলি প্রস্তুত রাখতে হয়। যার পুরোটাই অতিরিক্ত খরচ হিসেবে লোকসানের খাতায় জমা হয়। এর বিপরীতে দুধ মেলে অর্ধেক।’ বর্ষাকালের তিন মাসে কাঁচা ঘাস বা গোখাদ্য সংকটে দুর্দশার কথা জানাতে গিয়ে এসব বলছিলেন পাবনার বেড়া উপজেলার দক্ষিণ চর পেচাকোলা গ্রামের বকুল প্রামাণিক। তার খামারে বর্তমানে চারটি গাভি ও তিনটি বাছুর রয়েছে। এরমধ্যে তিনটি গাভি এরই মধ্যে গর্ভবতী হলেও এখনো দুধ দিচ্ছে।
এসব গাভির খাওয়া ও দুধের অনুপাত জানাতে গিয়ে বকুল প্রামাণিক বলেন, একটি ফ্রিজিয়ান, অস্ট্রেলিয়ান ও জার্সিসহ তিনটি গাভি থেকে দিনে দুইবার দোহালে প্রায় ৪০-৫০ লিটার দুধ পাওয়া যেত। কারণ তখন ভুসি-খৈলের সঙ্গে কাঁচাঘাস দিতে পারতাম। কিন্তু এখন সেটি হচ্ছে না। দিনে সর্বোচ্চ এ গাভীগুলো থেকে ২০-২৫ লিটার দুধ পাওয়া যাচ্ছে। এ দিয়ে উৎপাদন খরচ উঠছে না। উল্টো দুধের তুলনায় প্রতি গরুতে প্রায় আড়াই থেকে তিনশো টাকা বেশি খরচ হচ্ছে। এ মিলিয়ে চার গাভিকে মাসে ৩০-৩৫ ও তিন মাসে প্রায় লাখ টাকার মতো অতিরিক্ত খরচ হয়।
এই খামারি বলেন, গরু-বাছুর পালন বা চাষাবাদ করে আমাদের তেমন লাভ হয় না। এজন্য ঘরে টাকাও থাকে না। এর মধ্যে বর্ষা এলে খরচ বাড়ে। বাধ্য হয়ে বাছুর বা গরু বিক্রি করে অন্য গরুগুলোর জন্য খড়-ভুসি কিনতে হয়। কয়েকদিন আগে ৫২ হাজার টাকায় এক বাছুর বিক্রি করে ৪০ হাজার টাকার খ্যাড় (খড়) কিনলাম।
এ দশা শুধু বকুল বা বেড়ার দক্ষিণ চর পেচাকোলো গ্রামের খামারিদের নয়। উপজেলার চর সাড়াশিয়া, চর নাকালিয়াসহ তিনটি এলাকার ১২০ খামারির ৬০-৭০ জনেরই বর্ষায় একই অসুবিধায় দিন পার করতে হচ্ছে। এছাড়া জেলার সাঁথিয়া, সুজানগর, ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুর ও চাটমোহরসহ বিভিন্ন উপজেলার চর এলাকার নিম্নাঞ্চলগুলোর খামারিদেরও একই অবস্থা। বর্ষা বা ভারী বৃষ্টি হলেই ঘাসের নিচু জমি তলিয়ে যায় এবং কাঁচা ঘাসের তীব্র সংকট দেখা দেয়। বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত দামে ভুসি ও শুকনো খড় কিনে গবাদি পশু পালন করতে হয়। একদিকে খরচ বাড়লেও অন্যদিকে দুধের উৎপাদন না বেড়ে উল্টো অর্ধেকে নামে। বিশেষ করে ভাঙ্গুড়া ও ফরিদপুরের অধিকাংশ দুগ্ধ উৎপাদনকারী খামারগুলো নিচু এলাকায় হওয়ায় তারা আরও বেশি ভোগান্তিতে পড়েন।
প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্যমতে, ফরিদপুর উপজেলার ১৫০০-১৬০০ খামারের মধ্যে ৬০ শতাংশই বর্ষায় কাঁচাঘাসের তীব্র সংকটে ভোগে।

এ ব্যাপারে বেড়া উপজেলার চর নাকালিয়া গ্রামের ডেইরি খামারি ইব্রাহিম জানান, তার খামারে মোট সাতটি গাভি রয়েছে। তবে বর্তমানে দুধ দিচ্ছে ৪টি গাভি। কাঁচা ঘাসের সময় ৫০ লিটার হলেও এখন শুকনো খড়ে দুধ মিলছে ২০-২২ লিটার। ৪ বিঘা জমিতে ঘাস আবাদ করে খামার চলতো তার। সেগুলো বর্ষা ও টানা বৃষ্টিতে ডুবে গেছে। ফলে দুধ উৎপাদনও কমে গেছে।
তিনি বলেন, একটি ফ্রিজিয়ান জাতের গাভি দুই বেলায় ২০-২২ লিটার দুধ দিত। কাঁচা ঘাস না থাকায় সেই গাভি এখন ৭-১০ লিটারের বেশি দুধ দেয় না।
তিনি আরও বলেন, বর্ষার তিনমাস বাদে এই গাভিটি দিনে ৫০০ টাকার মতো খেলে দুধ দিত হাজার টাকার। এখন খাওয়ায় খরচ বাড়লেও দুধ পাচ্ছি চার থেকে সাড়ে চারশো টাকার। তাতে বছরের অন্য সময়ে খরচ উঠলেও এখন লোকসান।
ফরিদপুর উপজেলার বিলচান্দক এলাকার খামারি হাফিজা খাতুন ও বাবুল প্রামাণিকসহ কয়েকজন খামারি বলেন, ৭০০ টাকা মণ খ্যাড় (খড়)| এমনিতেই গরু পালন করে কোনো লাভ হয় না। বছর শেষে একটা বাছুর হয়ত কপালে থাকে। এরমধ্যে বর্ষার তিনমাসের খরচ আমাদের গায়ের ওপর উঠে যায়। এই সময়ের জন্য সরকার আমাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা বা সহায়তা দিলে ভালো হতো।
ফরিদপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. নুরুজ্জামান জানান, উপজেলার খামারগুলো থেকে প্রতিদিন ৩-৪ হাজার লিটার দুধ উৎপাদন হয়। কিন্তু বর্ষায় হাজার থেকে বারোশো লিটারের মতো কম হয়। কাঁচা ঘাস না থাকায় দানাদার খাবারে খামারিরা জোর দেন। ফলে তাদের প্রায় ৩০ শতাংশ খরচ বেড়ে যায়। তবে এই মৌসুমে লাভ না হলেও তেমন লোকসান হয় না তাদের।
এদিকে কাঁচা ঘাসের সংকটে দুধ উৎপাদন কমে যাওয়ায় সরবরাহ ঘাটতি দেখা দেয় প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান ও বাজারে।

এ ব্যাপারে বেড়ার নাকালিয়া এলাকার ঘোষ মতলব প্রামাণিক বলেন, বর্ষার তিন মাসে দুধ অনেক কমে যায়। স্বাভাবিক সময়ে সাধারণত ৪০ কেজির ১২-১৩ ক্যান দুধ বিভিন্ন খামার থেকে সংগ্রহ করে বিভিন্ন চিলিং সেন্টারে দিতাম। কিন্তু এখন পাচ্ছি সর্বোচ্চ ৭-৮ ক্যান।
সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ি দুধ সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান মিল্কভিটার উপমহাব্যবস্থাপক সাইদুল ইসলাম বলেন, কাঁচা ঘাস সংকট, অধিকাংশ গাভি গর্ভবতী থাকাসহ বেশকিছু কারণে এই তিন থেকে চারমাস দুধ উৎপাদনের অফ সিজন। আমাদের কারখানায় প্রতিদিন দুধ সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ৫০ হাজার লিটার। সংগ্রহ হচ্ছে ৩৭-৩৮ হাজার লিটারের মতো। আর অন্য সময়ে লক্ষ্যমাত্রাই থাকে এক লাখ থেকে এক লাখ দশ হাজার লিটারের মধ্যে। এসময় দুধ উৎপাদন কমের কারণে লক্ষ্যমাত্রাও প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে।
জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্য মতে, জেলায় নিবন্ধিত ৪ হাজার ৮৭৪ ও অনিবন্ধিত ৪ হাজার ৭৯১ টি দুগ্ধ উৎপাদনকারী খামার রয়েছে। এসব খামার থেকে বছরে ৩ দশমিক ৪ লাখ মেট্রিক টন দুধ উৎপাদন হয়ে থাকে।
এ ব্যাপারে পাবনা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. জহুরুল ইসলাম বলেন, অন্যান্যগুলোর বাইরে জেলার চার পাঁচটি উপজেলায় পনেরো থেকে বিশটির মতো চর এলাকা রয়েছে, যেখানে দুগ্ধ উৎপাদনকারী খামার রয়েছে। তবে চর হলেও অনেক এলাকা উঁচু হওয়ায় এসব এলাকার এক থেকে দুই তৃতীয়াংশ খামার বর্ষায় কাঁচা ঘাসের সংকটে পড়ে। এক্ষেত্রে খরচ বাড়লেও দুধ উৎপাদন স্বাভাবিক ও অব্যাহত রাখতে তারা গাভিকে বেশি করে দানাদার ও অন্যান্য খাদ্য খাওয়ান। ফলে দুধ উৎপাদন খুব বেশি কমে এমন নয়।
সংকট মোকাবিলার ক্ষেত্রে তিনি বলেন, বড় খামারিদের আমরা বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি ব্যবহারের পরামর্শ দেই। এক্ষেত্রে তারা সাইলেজ পদ্ধতিতে ঘাস সংরক্ষণ করে। যেটি বর্ষা মৌসুমে তারা ব্যবহার করেন। তবে বর্ষার এই কয়েক মাসে খামারিদের জন্য বিশেষ কোনো সুবিধা সরকারিভাবে দেওয়া যায় কি না সেটি ঊর্ধ্বতন মহলে জানানো হবে।
এফএ/এএসএম


