টানা-হ্যাঁচড়ায় চলছে খুলনা সদর হাসপাতাল
কাগজ কলমে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হলেও খুলনা সদর হাসপাতালে রয়েছে মাত্র ১০০টি শয্যা। বাকি শয্যার জন্য চলছে নতুন ভবনের নির্মাণ কাজ। কিন্তু দীর্ঘ প্রায় সাড়ে সাত বছরেও সম্পন্ন হয়নি ভবন নির্মাণ। হাসপাতালের আউটডোর ও ইনডোর মিলিয়ে প্রতিদিন হাজারের ওপর রোগীর চাপ থাকে। চাপ সামলাতে আউটডোর সেবা চলে টিনশেড ভবনে। সব মিলিয়ে শয্যা সংকট ও রোগীর চাপ নিয়ে চলছে খুলনা সদর হাসপাতাল। তবে আর মাত্র এক বছরের মধ্যে হাসপাতালের নতুন ভবনের কাজ সম্পন্ন হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
খুলনা গণপূর্ত অধিদপ্তর-১ সূত্রে জানা গেছে, খুলনা সদর হাসপাতালের শয্যা বর্ধিতকরণের জন্য ২০১৭ সালে প্রকল্প অনুমোদন পায়। ২০১৮ সালের আগস্টে প্রকল্পের কাজ শুরুর প্রাথমিক প্রক্রিয়া শুরু হয়। কিন্তু দরপত্র আহ্বান করার প্রায় তিন বছর পর ২০২০ সালে ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়। এর মধ্যে করোনাকালীন সময়ে প্রকল্পের কাজ বন্ধ ছিল। এরপর প্রকল্পের মেয়াদও বৃদ্ধি করা হয়। তখন নির্মাণ কাজের ব্যয় বৃদ্ধি পায়। সব মিলিয়ে ১২তলা ভবনের ফাউন্ডেশনে ছয় তলা ভবনের কাজ শেষ করতেই সময় লেগেছে প্রায় সাড়ে সাত বছর। এরপর প্রায় দেড় বছর প্রকল্পের কাজ বন্ধ ছিল।
২০২৬ সালে নতুন প্রকল্পের আওতায় বাজেট পেয়ে বাকি কাজ সম্পন্নের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। চলতি বছরের জুনের শেষ দিকে নতুন প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। ভবন নির্মাণ ও ভবনের আনুষঙ্গিক কাজের প্রকল্প এবার বাস্তবায়ন হলে প্রায় ২৪ কোটি টাকার কাজ সম্পন্ন হবে। সেখানে নতুন করে ভবনে যোগ হবে আরও দুই তলা। চলমান এই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবে ২০২৭ সালের জুন মাসে।
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, ১২তলা বিশিষ্ট এই হাসপাতালের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হলে ২৫০ শয্যার ব্যবস্থা থাকবে। অপারেশন থিয়েটার থাকবে দুইটি, লিফটের ব্যবস্থা থাকবে ৪টি এবং সিঁড়ির পয়েন্ট থাকবে দুই জায়গায়। এছাড়া চারতলা পর্যন্ত জরুরি সেবা থাকবে এবং তারপর থেকে শয্যা ব্যবস্থা করা হয়েছে। হাসপাতালের ভেতর থেকে অক্সিজেন লাইনের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের একজন প্রকৌশলী বলেন, খুলনা সদর হাসপাতালের টেন্ডারের কাজটি তৎকালীন সময়ে ‘জিকে শামীমের’ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পেয়েছিল। জিকে শামীমের কাছ থেকে সিন্ডিকেট করে বাগিয়ে নেয় খুলনার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাহবুব ব্রাদার্স। পরবর্তীতে মাহাবুব ব্রাদার্স কাজটি বাস্তবায়ন শুরু করে। কিন্তু প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতি করে প্রায় ৪ বছর অতিবাহিত করে ৫ আগস্টের পর প্রায় ৯ কোটি টাকার কাজ না করেই তিনি লাপাত্তা হয়ে যান। পরে নতুন করে টেন্ডার আহ্বান করা হয়। তৎকালীন প্রকৌশলী এবং রাজনৈতিক প্রভাবে এই হাসপাতালের কাজে এত দীর্ঘসূত্রিতা হয়। কিন্তু সংশ্লিষ্টদের শাস্তির আওতায় আনা হয়নি। পুরো বিষয়টি ধামাচাপা দিয়ে নতুন টেন্ডারের কাজ শুরু হয়েছে। এখন তদন্ত করে অনিয়মের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে আমাদের দপ্তরের অনেকেই ফেঁসে যাবেন।
খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, খুলনা সদর হাসপাতাল ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হলেও তা এখনো কাগজে কলমে রয়েছে। সাড়ে সাত বছরেও নতুন ভবনের কাজ সম্পন্ন হয়নি। প্রকল্পের নামে দীর্ঘদিন কাজ ফেলে রেখে এবং মেয়াদের পর মেয়াদ বৃদ্ধি করে একটি মহল লাভবান হয়েছে। এগুলো সাধারণ মানুষের সঙ্গে তামাশা ছাড়া কিছু না। এখন চিকিৎসাসেবা কেন্দ্রিক প্রকল্পগুলোর দ্রুত বাস্তবায়ন এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, খুলনা সদর হাসপাতালে নতুন ভবন নির্মাণে দীর্ঘ সময় ব্যয় হওয়ায় রোগী ভোগান্তি বেড়েই চলেছে। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫০০ শয্যার বিপরীতে হাজারের বেশি রোগী ভর্তি থাকে। শহরের অনেক রোগী চলে আসেন সদর হাসপাতালে। কিন্তু এখানেও সমস্যা রয়ে গেছে। স্বাস্থ্যখাতে জটিলতা নিরসন করে জনগণের প্রাপ্য চিকিৎসাসেবাকে শতভাগ নিশ্চিত করতে হবে।
খুলনা গণপূর্ত অধিদপ্তর-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুল ইসলাম বলেন, হাসপাতালের কাজ সম্পন্ন করতে নতুন করে দুইটি কাজের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে কাজ শুরু হয়েছে। এই কাজ বাস্তবায়ন হলে নতুন করে দুইটি ফ্লোর ভবনে যোগ হবে। আশা করছি আগামী বছরের জুনের মধ্যে নতুন গৃহীত প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হবে। হাসপাতালের কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হবে।

অন্যদিকে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালে বর্তমানে ১০০ শয্যার ব্যবস্থা রয়েছে। হাসপাতালে প্রতিদিন ১৫০-১৭০ জন পর্যন্ত রোগী ভর্তি থাকেন। আউটডোরে প্রতিদিন হাজারের ওপর রোগী আসেন চিকিৎসা নিতে। আর এখন একটি মাত্র অপারেশন থিয়েটার চলছে। শিশুদের জন্য শয্যা রয়েছে মাত্র ৬টি।
হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, হাসপাতালে বহির্বিভাগের কাজ চলছে বাইরের টিনশেড ভবনে। ভর্তি রোগীরা হাসপাতালের বারান্দায় বিছানা পেতে রয়েছেন। নিচ্ছেন চিকিৎসাসেবা। ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন ৩৫-৪০ জন। হাসপাতালের শয্যা সংখ্যার বিপরীতে ৪০-৫০ জন রোগী ভর্তি বেশি রয়েছেন।
খুলনা ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট খুলনা সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. গাজী রফিকুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে হাসপাতালে ১০০ শয্যার ব্যবস্থা থাকলেও রোগী আরও বেশি থাকে। তবে নতুন ভবন নির্মাণ হলে আরও ১৫০ শয্যা চালু করা সম্ভব হবে। সেবাগ্রহীতাদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। অনেক দৌড়ঝাঁপ করে এই কাজ বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। আশা করছি খুব দ্রুত কাজ সমাপ্ত হবে। এরপর জনবল নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে সেবা প্রদান কার্যক্রমকে ত্বরান্বিত করা সম্ভব হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

তিনি বলেন, নতুন ভবনের কাজ সম্পন্ন হলে ১০টি কমন সিসিইউ, ১০টি আইসিইউ এবং ১০টি স্ক্যানো বেড চালু করা সম্ভব হবে।
এমআরআই, সিটি স্ক্যান এবং মেমোগ্রাফী সার্ভিস চালু করাও সম্ভব হবে। এছাড়া রাজস্ব খাতে বড় ধরনের জনবলও নিয়োগ হবে।
তিনি আরও বলেন, শতভাগ চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে আমরা কাজ করছি। ৭০ ধরনের সরকারি ওষুধ রোগীদের দেওয়া হচ্ছে। জায়গার স্বল্পতা থাকলেও তার মধ্যেই চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করছি। তবে নতুন ভবন নির্মিত হলে সেবা প্রদানের সুযোগ ও গতি দুই বৃদ্ধি পাবে।
এফএ/এএসএম


