সোনালি আঁশে ৫৪৯ কোটি টাকা আয়ের স্বপ্ন বুনছেন রাজশাহীর কৃষকরা

মনির হোসেন মাহিন মনির হোসেন মাহিন , বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক, রাবি
প্রকাশিত: ১০:৫৫ এএম, ২৭ আগস্ট ২০২৬
পাট জাগ দিচ্ছেন চাষিরা/ ছবি: জাগো নিউজ

মৌসুমের শুরু থেকেই অনুকূল আবহাওয়া এবং কৃষকদের নিবিড় পরিচর্যায় রাজশাহীতে এবার সোনালি আঁশ পাটের বাম্পার ফলন হয়েছে। শুধু ফলনই নয়, বাজারে পাটের ভালো দাম এবং রেকর্ড পরিমাণ উৎপাদন স্থানীয় কৃষকদের মুখে হাসি ফুটিয়েছে। এ বছর জেলার উৎপাদিত পাট বিক্রি করে প্রায় ৫৪৯ কোটি টাকা আয় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে রাজশাহী জেলার ৯টি উপজেলাতেই কমবেশি পাটের আবাদ হয়েছে। জেলায় এবার মোট ১৮ হাজার ৩৯৯ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ করা হয়েছে। এই জমি থেকে ৪৯ হাজার টন পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর বিপরীতে গত বছর (২০২৫ সালে) ১৭ হাজার ৩০৫ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছিল এবং উৎপাদন হয়েছিল ৪৮ হাজার ৬৭৭ টন।

তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, গতবারের তুলনায় এবার আবাদি জমির পরিমাণ বেড়েছে। পাশাপাশি উৎপাদনও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে পাট চাষ থেকে কৃষকদের আয়ও বাড়বে বলে আশা করছেন কৃষি বিভাগ।

‘রাজশাহী জেলায় এবার মোট ১৮ হাজার ৩৯৯ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ করা হয়েছে। এই জমি থেকে ৪৯ হাজার টন পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর বিপরীতে গত বছর ১৭ হাজার ৩০৫ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছিল এবং উৎপাদন হয়েছিল ৪৮ হাজার ৬৭৭ টন। এখন প্রতি মণ পাট ৪ হাজার ৩০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। সেই অনুযায়ী, এ বছর পাট বিক্রি করে প্রায় ৫৪৯ কোটি টাকা আয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। এই পাট স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি পাটজাত পণ্য তৈরিকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হচ্ছে।’

চলতি মৌসুমে পাট কাটা, জাগ দেওয়া এবং আঁশ ছাড়ানোর কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। কৃষি বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ইতোমধ্যে জেলার মোট আবাদি জমির ৮২ শতাংশের পাট সংগ্রহ সম্পন্ন হয়েছে। আর এসব জমি থেকেই উৎপাদিত হয়েছে ৪৮ হাজার ২০০ টন পাট। বাকি ১৮ শতাংশ জমির পাট কাটা শেষ হলে মোট উৎপাদনের পরিমাণ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রাকে ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার পাটের বাজারদরও বেশ সন্তোষজনক। বর্তমানে স্থানীয় বাজারগুলোতে প্রতি মণ (৪০ কেজি) পাট ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ৩০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। হিসাব অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলার মোট প্রত্যাশিত উৎপাদন থেকে পাট বিক্রি করে প্রায় ৫৪৮ কোটি ৮২ লাখ টাকা আয় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থের লেনদেন গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আরও পড়ুন

সার না পেয়ে গুদাম লুট, বাস্তবে সংকট কতটা?

রাজশাহীর বাঘা উপজেলার মনিগ্রাম এলাকার পাটচাষি মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, গতবার পাটের দাম কিছুটা কম থাকায় আমাদের মনে হতাশা ছিল। কিন্তু আল্লাহর রহমতে এবার ফলনও ভালো হয়েছে, আবার বাজারে দামও পাচ্ছি খুব ভালো। প্রতি মণ পাট ৪ হাজার টাকার ওপরে বিক্রি করতে পারছি। উৎপাদন খরচ মিটিয়ে এই দামে ভালো লাভ থাকছে।

বিক্রিরে জন্য হাটে নেওয়া হচ্ছে পাট/ ছবি: জাগো নিউজ

মোহনপুর উপজেলার কৃষক আব্দুল মতিন বলেন, এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় পাট জাগ দেওয়া ও ধোয়া নিয়ে তেমন কোনো বিপাকে পড়তে হয়নি। বর্তমান বাজারে পাটের যে দাম পাওয়া যাচ্ছে, তাতে আমাদের অনেক উপকার হয়েছে। এ বছর পরিবারের সব খরচ মিটিয়ে বেশ কিছু টাকা সঞ্চয় করা সম্ভব হবে। প্রথমদিকে বৃষ্টি না হওয়ায় কিছুটা সমস্যা হয়েছিল। পরে পর্যাপ্ত বৃষ্টি হওয়ায় আমরা সুবিধা পাচ্ছি।

‘বিশেষ করে প্রায় ৫৪৯ কোটি টাকার অর্থনৈতিক লেনদেন হলে এর একটি বড় অংশ গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রবাহিত হবে। তবে কৃষক যেন ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত না হন, সে জন্য মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানো, সংরক্ষণ সুবিধা বৃদ্ধি এবং কৃষকদের সরাসরি বাজারজাতকরণের সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি পাটের বহুমুখী ব্যবহার বাড়ানো এবং পাটজাত পণ্যের রপ্তানি সম্প্রসারণ করা গেলে রাজশাহীর কৃষি অর্থনীতিতে পাট আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।’

পবা উপজেলার কৃষক রবিউল ইসলাম জানান, তিনি চার বিঘা জমিতে আগাম জাতের পাট চাষ করেছেন। গাছের বৃদ্ধি ভালো হয়েছে।

তিনি বলেন, এবার ফলন ভালো হবে বলে আশা করছি। বাজারে যদি বর্তমান দাম বজায় থাকে, তাহলে খরচ বাদ দিয়েও ভালো লাভ করা সম্ভব হবে। তবে শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে এবং পাট জাগ দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত পানির সংকট এখনও বড় সমস্যা।

বাগমারা উপজেলার কৃষক মো. সাইদুর রহমান পাঁচ বিঘা জমিতে পাট চাষ করেছেন। তিনি বলেন, গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার জমির অবস্থা অনেক ভালো। তবে উৎপাদনের পাশাপাশি বাজারজাতকরণ সহজ করতে হবে। সরকারি সহায়তা বাড়ানো হলে কৃষকেরা আরও বেশি উৎসাহিত হবেন।

আরও পড়ুন

বন্যায় বাঁশখালী-সাতকানিয়ার ১৫৮ কিমি সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত, দুর্ভোগ চরমে

চারঘাট উপজেলার কৃষক হৃদয় বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার পাটের বৃদ্ধি অনেক ভালো। কৃষক যদি ন্যায্যমূল্য পান, তাহলে আগামী বছর আরও বেশি জমিতে পাট চাষ হবে।

‘গতবার পাটের দাম কিছুটা কম থাকায় আমাদের মনে হতাশা ছিল। কিন্তু আল্লাহর রহমতে এবার ফলনও ভালো হয়েছে, আবার বাজারে দামও পাচ্ছি খুব ভালো। প্রতি মণ পাট ৪ হাজার টাকার ওপরে বিক্রি করতে পারছি। উৎপাদন খরচ মিটিয়ে এই দামে ভালো লাভ থাকছে।’

রাজশাহীতে উৎপাদিত এই সোনালি আঁশ শুধু স্থানীয় চাহিদা মেটাতেই সীমাবদ্ধ নয়। জেলার চাহিদা মেটানোর পর এখানকার পাট দেশের বিভিন্ন বড় পাটজাত পণ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করা হচ্ছে। এছাড়া এসব পাট প্রক্রিয়াজাত করে বিভিন্ন ধরনের পাটপণ্য তৈরি করা হচ্ছে, যার একটি অংশ আন্তর্জাতিক বাজারেও রপ্তানি হচ্ছে। ফলে রাজশাহীর পাট জাতীয় অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

কৃষি সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সরকারি সহায়তা, সময়মতো উন্নত বীজ ও সারের সহজলভ্যতা এবং বর্তমান বাজারদর এভাবে বজায় থাকলে আগামী দিনে রাজশাহী অঞ্চলে পাটের আবাদ আরও বাড়বে এবং কৃষকেরা বেশি লাভবান হবেন।

রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) মিতা সরকার বলেন, রাজশাহী জেলায় এবার মোট ১৮ হাজার ৩৯৯ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ করা হয়েছে। এই জমি থেকে ৪৯ হাজার টন পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর বিপরীতে গত বছর ১৭ হাজার ৩০৫ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছিল এবং উৎপাদন হয়েছিল ৪৮ হাজার ৬৭৭ টন। এখন প্রতি মণ পাট ৪ হাজার ৩০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। সেই অনুযায়ী, এ বছর পাট বিক্রি করে প্রায় ৫৪৯ কোটি টাকা আয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। এই পাট স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি পাটজাত পণ্য তৈরিকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হচ্ছে।

পাট অধিদপ্তর রাজশাহীর সহকারী পরিচালক মো. নাদিম আক্তার জানান, চলতি বছর জেলায় প্রায় ৩ লাখ ৮১ হাজার ৬৯৬ কুইন্টাল পাট উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। গত বছর উৎপাদন হয়েছিল ৩ লাখ ৬০ হাজার ৪৯৪ কুইন্টাল। অর্থাৎ এবার প্রায় ২১ হাজার ২০২ কুইন্টাল বেশি উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, বর্তমানে বাজারে প্রতি মণ পাট ৪ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সরকার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ায় কৃষকদের আগ্রহও বাড়ছে।

আরও পড়ুন

সড়ক-অ্যাম্বুলেন্স নেই, স্বজনের কাঁধই ভরসা

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম বলেন, একসময় বাংলাদেশের সোনালি পাট দেশ-বিদেশে ব্যাপকভাবে খ্যাতি অর্জন করেছিল। কিন্তু নানা কারণে এখন অনেকটাই পাট উৎপাদন থেকে বাংলাদেশ সরে এসেছে। রাজশাহীতে পাটের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং একই সঙ্গে বাজারে ভালো দাম পাওয়ার বিষয়টি কৃষক ও সামগ্রিক গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক। পাট বিক্রি করে কৃষকের আয় বাড়লে তাদের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। এতে স্থানীয় বাজারে পণ্য ও সেবার চাহিদা বাড়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও ক্ষুদ্র ব্যবসা-বাণিজ্যেও গতি আসতে পারে।

তিনি আরও বলেন, বিশেষ করে প্রায় ৫৪৯ কোটি টাকার অর্থনৈতিক লেনদেন হলে এর একটি বড় অংশ গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রবাহিত হবে। তবে কৃষক যেন ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত না হন, সে জন্য মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানো, সংরক্ষণ সুবিধা বৃদ্ধি এবং কৃষকদের সরাসরি বাজারজাতকরণের সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি পাটের বহুমুখী ব্যবহার বাড়ানো এবং পাটজাত পণ্যের রপ্তানি সম্প্রসারণ করা গেলে রাজশাহীর কৃষি অর্থনীতিতে পাট আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এনএইচআর/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন jagofeature@gmail.com ঠিকানায়।