সপরিবারে শিক্ষক হত্যা
বাড়ির দেওয়ালের ওপারেই খুনির বসবাস, ডাকতেন ‘স্যার’ বলে
- ইয়াবা সেবন দেখে ফেলায় খুন
- হত্যাকাণ্ডের পর বাড়িতেই গোসল সারে ঘাতকরা
- ফ্রিজ থেকে খাবার খেয়ে জুমার ওয়াক্তে পলায়ন
রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়া (দাসপাড়া) এলাকায় অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল (৬৫), তার স্ত্রী এবং দুই সন্তানকে হত্যার ঘটনায় গ্রেফতার দুই যুবকের একজন সিদ্ধার্থ দাস। তার বাড়ি নিহত শিক্ষক পরিবারের সীমানা প্রাচীরের ঠিক ওপাশেই। আর অপর পাশে তিনতলা বাড়ির মালিক গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা। নিচতলা ও তৃতীয় তলার নির্মাণ কাজ চলমান।
নির্মাণাধীন ওই বাড়ির দোতলায় পরিবার নিয়ে ভাড়া থাকেন অবসরপ্রাপ্ত কলেজশিক্ষক হিমাংশু কুমার। আর খানিকটা দূরে মুগ্ধ দাসের বাড়ি। হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস নিহত শিক্ষক পরিবারটির পরিচিত মুখ ছিল।
‘ঘটনার দিন ওই বাড়ির ছাদে উঠে মাদক (ইয়াবা) সেবন করছিল অভিযুক্তরা। বিষয়টি বাড়ির মালিক গণপতি চক্রবর্তী দেখে ফেলায় এবং তাদের চিনে ফেলায় চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সেই অপরাধ ঢাকতেই একে একে পরিবারের চার সদস্যকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন তারা’
শনিবার (২২ আগস্ট) রাতে মাছুয়াপাড়ার ওই বাড়ি থেকে শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) এবং পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়মের (১২) মরদেহ উদ্ধার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ ঘটনায় রোববার ভোরে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থকে আটক করে পুলিশ।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গণপতি চক্রবর্তীকে ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করতেন সিদ্ধার্থ। তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তীকে ডাকতেন ‘কাকি’ বলে। এতটা কাছের প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ বিস্ময় প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
‘রংপুর জিলা স্কুলের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে অবসরে যান। তিনি নগরীর বাংলাদেশ ব্যাংক মোড় এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন। নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকায় জমি কিনে সেখানে বাড়ি নির্মাণ শুরু করেন। দোতলা বাড়ির নিচতলার কাজ শেষ হয়নি। প্রায় দুই-তিন বছর আগে দোতলায় পরিবার নিয়ে বসবাস করে আসছিলেন। অবসরে যাওয়ার পর হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক হিসেবে রোগীও দেখতেন তিনি’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রংপুর জিলা স্কুলের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে অবসরে যান। তিনি নগরীর বাংলাদেশ ব্যাংক মোড় এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন। নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকায় জমি কিনে সেখানে বাড়ি নির্মাণ শুরু করেন। দোতলা বাড়ির নিচতলার কাজ শেষ হয়নি। প্রায় দুই-তিন বছর আগে দোতলায় পরিবার নিয়ে বসবাস করে আসছিলেন। অবসরে যাওয়ার পর হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক হিসেবে রোগীও দেখতেন তিনি।
মুগ্ধ দাসের বাবা কানু দাস আনুমানিক ১৫ বছর আগে আগে মারা গেছেন। দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার ছোট মুগ্ধ বড় ভাইয়ের মতো মাছ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। বিনয় দাসের ছেলে সিদ্ধার্থ দাস নগরীর দেওয়ানবাড়ি এলাকায় পিকে জুয়েলার্সে কাজ করেন।

পুলিশের তদন্ত ও আসামিদের জবানবন্দিতে জানা যায়, ঘটনার দিন ওই বাড়ির ছাদে উঠে মাদক (ইয়াবা) সেবন করছিল অভিযুক্তরা। বিষয়টি বাড়ির মালিক গণপতি চক্রবর্তী দেখে ফেলায় এবং তাদের চিনে ফেলায় চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সেই অপরাধ ঢাকতেই একে একে পরিবারের চার সদস্যকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন তারা। হত্যাকাণ্ডের পর দেয়াল টপকে কিংবা পাশের বাড়ির ছাদ ব্যবহার করে সহজেই পালিয়ে যান।
হত্যাকাণ্ডের পর বাড়ির ভেতরেই গোসল সেরে এবং ফ্রিজ থেকে খাবার খেয়ে জুমার ওয়াক্তে ঘাতকরা পালিয়ে যান বলে পুলিশ জানায়।
প্রতিবেশীর এমন নৃশংসতায় গোটা মাছুয়াপাড়া এলাকায় শোকাবহ পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। সেইসঙ্গে তীব্র ক্ষোভ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। শিক্ষক পরিবারের এমন করুণ পরিণতিতে সাধারণ মানুষ স্তম্ভিত।

জানতে চাইলে প্রতিবেশী হিমাংশু কুমার জানান, দুবছর ধরে ওই এলাকায় পূর্ব পরিচিত ব্যক্তির বাড়ির দোতলায় ভাড়াটিয়া হিসেবে বসবাস করে আসছেন। এক ছেলে একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন। প্রতিদিনের মতো বৃহস্পতিবার (১৮ আগস্ট) দিনগত রাতে বাড়িতে ঢোকার প্রধান গেটে তালা লাগিয়ে স্ত্রীসহ তারা ঘুমিয়ে পড়েন। গরমের কারণে ফ্যান চালু থাকলে সাধারণত বাইরে থেকে কোনো শব্দ বা চিৎকার কানে আসে না। তাই সেদিন রাতে বা ভোরে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়িতে বা ছাদে কোনো চিৎকার হলেও তা শুনতে পারেননি তারা।
স্বাভাবিকভাবে পরদিন শুক্রবার সকালে নিজেই গেটের তালা খোলেন। তবে গেট বন্ধ থাকলেও বাড়ির চারপাশের দেওয়াল খুব বেশি উঁচু না। অভিযুক্তরা যেকোনোভাবে ওই দেওয়াল টপকে নির্মাণাধীন তিনতলা ওই বাড়ির দোতলার ছাদে যেতে পারেন বলে ধারণা করেন হিমাংশু।
সরেজমিন দেখা যায়, সিদ্ধার্থ দাসের টিনশেড বাড়ি সংলগ্ন গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ি। মাঝখানে শুধু একটি দেওয়াল। ওই দেওয়াল টপকে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ি এবং হিমাংশু কুমারের ভাড়া বাড়িতেও আসাটা খুবই সহজ।

এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় রোববার (২৩ আগস্ট) বিকেলে নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে থানায় হত্যা মামলা করেন। পরে রাতে গ্রেফতার দুই আসামিকে আদালতে হাজির করা হলে তারা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মিলন চ্যাটার্জি বলেন, ‘সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে আমাদের কাছে আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। এজন্য তাদেরকে আমরা আদালতে হাজির করেছিলাম। মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে, সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে আদালতে আসামিদের উপস্থাপন করা হয়। আসামিরা নিজেদের দোষ স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।’

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রংপুর জেলার সভাপতি অধ্যক্ষ ফখরুল আনাম বেঞ্জু বলেন, ‘মর্মান্তিক এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় অনেক প্রশ্নের উত্তর মিলছে না। নেপথ্যের প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি।’
এসআর/এএসএম




