শখের নার্সারি থেকে রাখির মাসে আয় লাখ টাকা
শখ থেকে শুরু করে। প্রবল ইচ্ছাশক্তি আর বৃক্ষপ্রেমকে পুঁজি করে সফল উদ্যোক্তা হয়ে উঠেছেন নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার আতিফা নাসরিন রাখি। মাত্র এক হাজার টাকার ক্যাকটাস দিয়ে পথচলা শুরু করা তার ‘প্লান্টোলজি’ নার্সারিতে এখন স্থান পেয়েছে হাজার প্রজাতির দেশি-বিদেশি উদ্ভিদ। বাণিজ্যিক রূপ নেওয়া এই নার্সারি থেকে বর্তমানে সব খরচ বাদ দিয়ে প্রতি মাসে লাখ টাকার কাছাকাছি আয় করছেন এই নারী উদ্যোক্তা।
রাখির এই নার্সারিতে রয়েছে দেশি-বিদেশি নানারকম ফলদ, বনজ, ঔষধি এবং শোভাবর্ধনকারী গাছ। বিশেষ করে বিরল প্রজাতির ইনডোর প্ল্যান্ট ও অর্কিডের প্রতি বৃক্ষপ্রেমীদের আকর্ষণ সবচেয়ে বেশি। প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ তার নার্সারিতে আসছেন পছন্দের গাছ কিনতে। গ্রাহকদের মানসম্মত চারা ও সঠিক পরামর্শ দেওয়ার কারণে অল্প সময়েই বিশ্বস্ততা অর্জন করেছেন তিনি।
‘নার্সারিতে রয়েছে ক্যাকটাস, সাকুলেন্ট, স্যানসেভেরিয়া, অ্যালোভেরা, আগলোনেমা, কোলিয়াস, ট্রেডেস্কান্টিয়া, মনস্টেরা, ফিলোডেনড্রন, মানিপ্ল্যান্ট, বাগানবিলাস, কাঁটামুকুট, অর্কিডসহ নানান ধরনের ইনডোর প্ল্যান্ট, ফুল ও পাতাবাহার গাছ। সব মিলিয়ে রয়েছে ১৫-২০ লাখ টাকা মূল্যের গাছের চারা’
দুই জোড়া ক্যাকটাসের চারা থেকে শুরু
শখ থেকে শুরু করা এই উদ্যোক্তার পুরো নাম আতিফা নাসরিন রাখি। তিনি নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার গয়াবাড়ী গ্রামের ব্যবসায়ী শাকিল খানের স্ত্রী। তার নার্সারির নাম ‘প্লান্টোলজি’। ২০২০ সালে ঘর সাজাতে মাত্র এক হাজার টাকা দিয়ে কিনেছিলেন দুই জোড়া ক্যাকটাসের চারা। এরপর গাছের প্রতি ভালোবাসা আর নতুন নতুন প্রজাতি সংগ্রহের নেশা ধীরে ধীরে তাকে নিয়ে যায় উদ্যোক্তা হওয়ার পথে। শখের সেই বাগানই এখন পরিণত হয়েছে বাণিজ্যিক নার্সারিতে।
তার নার্সারিতে রয়েছে ক্যাকটাস, সাকুলেন্ট, স্যানসেভেরিয়া, অ্যালোভেরা, আগলোনেমা, কোলিয়াস, ট্রেডেস্কান্টিয়া, মনস্টেরা, ফিলোডেনড্রন, মানিপ্ল্যান্ট, বাগানবিলাস, কাঁটামুকুট, অর্কিডসহ নানান ধরনের ইনডোর প্ল্যান্ট, ফুল ও পাতাবাহার গাছ। সব মিলিয়ে রয়েছে ১৫-২০ লাখ টাকা মূল্যের গাছের চারা।
‘অনলাইনের পাশাপাশি নার্সারি থেকেও সরাসরি চারা বিক্রি করেন রাখি। ‘প্লান্টোলজি’ নামে তার একটি অনলাইন পেজও রয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বাগানপ্রেমীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গাছের ছবি ও ভিডিও দেখে অর্ডার করেন। পরে কুরিয়ারের মাধ্যমে বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে দেওয়া হয় গাছের চারা’
অনলাইনের পাশাপাশি নার্সারি থেকেও সরাসরি চারা বিক্রি করেন রাখি। ‘প্লান্টোলজি’ নামে তার একটি অনলাইন পেজও রয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বাগানপ্রেমীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গাছের ছবি ও ভিডিও দেখে অর্ডার করেন। পরে কুরিয়ারের মাধ্যমে বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে দেওয়া হয় গাছের চারা।

জামের রস যাচ্ছে বিদেশে, বিচিও ফেলনা নয়

শখের এ উদ্যোগকে আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে দিতে বিভিন্ন মেলা ও প্রদর্শনীতেও অংশ নিচ্ছেন রাখি। সম্প্রতি রংপুরের একটি বাণিজ্য মেলায় দুটি স্টল নিয়ে অংশ নেন তিনি। সেখানে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ ও চারা প্রদর্শন ও বিক্রি করেন। দর্শনার্থী ও বাগানপ্রেমীদের কাছ থেকে ভালো সাড়া পাওয়ার পাশাপাশি আশানুরূপ বিক্রিও হয়েছে বলে জানান তিনি।
যেন ‘সবুজ স্বর্গ’
সরেজমিন দেখা যায়, নার্সারিতে বিভিন্ন আকারের টব ও ঝুলন্ত পাত্রে সাজানো রয়েছে নানা প্রজাতির গাছ। ছাউনি ও মাচার নিচে সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়েছে ক্যাকটাস, সাকুলেন্ট, স্যানসেভেরিয়া ও পাতাবাহার। রঙিন পাতার আগলোনেমা, কোলিয়াস, মনস্টেরা ও ফিলোডেনড্রনের পাশাপাশি রয়েছে জেড প্ল্যান্ট, ইকেভেরিয়া ও হাওর্থিয়াসহ বিভিন্ন জাতের সাকুলেন্ট। বৈচিত্র্যময় আকৃতি ও রঙের ক্যাকটাসও নজর কাড়ে দর্শনার্থীদের।
ভবিষ্যতে নার্সারির পরিধি আরও বড় করার পরিকল্পনা রয়েছে রাখির। আলাপকালে এই উদ্যোক্তা জানান, শুরুতে পথচলাটা খুব সহজ ছিল না। কিন্তু সঠিক পরিচর্যা, ধৈর্য এবং অধ্যবসায়ের কারণে আজ তার নার্সারিটি সুদৃশ্য ‘সবুজ স্বর্গে’ পরিণত হয়েছে। নার্সারি পরিচালনা ও পরিচর্যায় তিনি স্থানীয় কয়েকজনের কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি করেছেন।

ঘর থেকেই গড়ে ওঠে তামান্নার সফলতার সিঁড়ি
নার্সারি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে পরিবারের সহযোগিতার কথাও অকপটে স্বীকার করেন তিনি। তার স্বামী শাকিল খান ও শাশুড়ি সাজেদা বেগম শুরু থেকেই তাকে সহযোগিতা করেছেন। প্রথম দিকে একাই নার্সারির কাজ সামলালেও বর্তমানে দুই থেকে তিনজন কর্মচারী নিয়মিত তার সঙ্গে কাজ করছেন।

উদ্যোক্তা রাখির ভাষ্যমতে, গাছের পরিচর্যা ও অন্যান্য খরচ বাদ দিয়ে বর্তমানে প্রতি মাসে প্রায় ৮০ হাজার টাকা লাভ থাকে। বিক্রি ভালো হলে মাসিক আয় লাখ টাকা পর্যন্ত ছাড়িয়ে যায়। তবে গাছের ব্যবসায় লাভ করতে হলে ধৈর্য ও নিয়মিত পরিচর্যার বিকল্প নেই বলে মনে করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘প্রতিটি গাছের জন্য আলাদা পরিচর্যা প্রয়োজন। কোন গাছে কতটুকু পানি, কী ধরনের মাটি ও সার প্রয়োজন—এসব বিষয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হয়েছে। গাছের রোগবালাই শনাক্ত করে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হয়।’
রাখির মতে, অল্প জায়গা নিয়েও এ ধরনের নার্সারি গড়ে তোলা সম্ভব। বাড়ির আঙিনা, ছাদ কিংবা পতিত জমি কাজে লাগিয়ে সামান্য প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শুরু করা যায়। সঠিক পরিচর্যা ও ব্যবস্থাপনা করতে পারলে এটি বাড়তি আয়ের ভালো উৎস হতে পারে। বিশেষ করে নারীরা সংসারের কাজের পাশাপাশি এ ধরনের উদ্যোগ নিয়ে নিজেদের কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারেন।

নার্সারিটি পরিদর্শন করে ডিমলা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মীর হাসান আল বান্না জাগো নিউজকে বলেন, ‘রাখির উদ্যোগটি বেশ প্রশংসনীয়। তিনি শখকে কাজে লাগিয়ে একটি সম্ভাবনাময় নার্সারি গড়ে তুলেছেন। এখানে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা রয়েছে, যা এলাকার মানুষের মধ্যে বাগান করার আগ্রহও তৈরি করছে। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে তাকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হবে।’
কৃষি কর্মকর্তা আরও বলেন, বাণিজ্যিকভাবে ফুল ও শোভাবর্ধক গাছের নার্সারি গড়ে তোলার মাধ্যমে গ্রামীণ নারীদের স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও পরিবেশের সৌন্দর্য বৃদ্ধিতেও এ ধরনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এএইচকিউ/এসআর/এএসএম



